সুন্দর পশু-পাখি, সুন্দর গাছ আর সুন্দর সুন্দর জঙ্গল নিয়ে সুন্দরবন

...প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এদেশের মানুষের পক্ষ হয়ে বর্ম হিসেবে দাড়িয়ে যাওয়া সুন্দরবনের সাথে বেশীর ভাগ মানুষের প্রথম পরিচয় হয় বাংলা ১ম পত্রের গদ্য বইয়ে অথবা বাংলা ২য় পত্রের রচনায়। সুন্দরবন - এর আক্ষরিক অর্থ 'সুন্দর জঙ্গল' অথবা 'সুন্দর বনভূমি' কিন্তু নামকরণ হয়েছিল 'সুন্দরী গাছ' থেকে যা এখানে প্রচুর পরিমানে জন্মে। তবে যেহেতু স্থানীয় আদিবাসীরা অনেক আগে থেকে বনটিকে ‘চন্দ্র-বান্ধে’ নামে ডাকতো তাই হতে পারে ‘চন্দ্র-বান্ধে’ নামটি কালের পরিক্রমায় ‘সুন্দরবন’ হয়ে গেছে।



  • বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেষে অবস্থিত এই বনের বাঘ ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ নামে পরিচিত যদিও সংখ্যায় এখন এ প্রাণী ক্রমনিম্নগামী। সুন্দরবন সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় অবস্থিত হবার কারনে এখানকার পানি নোনতা এবং এই লবণাক্ততার কারণে বাঘ অস্বস্তিকর অবস্থায় থাকে যা তাদের বেশ আগ্রাসী করে তোলে তাই  মাছ ও মধু সংগ্রহকারী মানুষদের উপর সুযোগ পেলে তারা ঝাপিয়ে পরে।
  • ১৭৫৭ সালে পুরো বাংলার ইজারা নেয় বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যার মধ্যে সুন্দরবনও ছিল। এই বনের গুরুত্ব বুঝতে পেরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একটা মানচিত্র তৈরি করে সেইসময়। ১৮২৮ সালে বৃটিশ সরকার সুন্দরবনকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে নিজেদের অধীনে নিয়ে নেয় এবং একটি জরিপ চালায়। ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে হওয়া দেশ-ভাগের সময় সুন্দরবনও ভাগ হয়ে যায়। মোট ১০,০০০ বর্গ কি.মি. আয়তনের ৬,০১৭ বর্গ কি.মি বাংলাদেশের ( পূর্বতন পাকিস্তান ) ভাগে আসে যদিও পশুপাখি মুসলমান হিন্দু কোনটাই ছিল না বা এখনো নয়।
  • সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে শত শত খাল যার মধ্যে বলেশ্বর, রায়মংগল, শিবসা ও পশুর বেশী পরিচিতি পেয়েছে। বন্যপ্রাণীর মধ্যে  বেশী পরিচিতি পেয়েছে বাঘ, হরিণ, বানর, শুকর, কুমির, গুইসাপ, অজগর, হরিয়াল, বালিহাঁস, গাংচিল, বক, মদনটাক, চখা, ঈগল, চিল ও মাছরাঙা। আর গাছের মধ্যে সুন্দরী গাছ ছাড়া আছে গেওয়া, কেওড়া, গরান ও ধুন্দল।
  • কালের পরিক্রমায় সুন্দরবন দিন দিন ছোট হয়ে আসছে; মানুষ তাদের প্রয়োজনে বন কাটছে আর সাগর তার প্রয়োজনে দিন দিন উচু হয়ে সুন্দরবনকে গ্রাস করছে।
  • সুন্দরবনের বনসম্পদের উপর নির্ভর করে বেশকিছু শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে যার মধ্যে আছে খুলনার নিউজপ্রিন্ট মিলস ও হার্ডবোর্ড মিলস। সুন্দরবনের গেওয়া গাছ থেকে আসে নিউজপ্রিন্টের কাচামাল আর সুন্দরী গাছ থেকে আসে হার্ডবোর্ডের কাচামাল। এছাড়া দিয়াশলাই ও নৌকা তৈরির কাচামালও সুন্দরবন থেকে নেয়া হয়। 

এক নজরে সুন্দরবনঃ 
-সুন্দরবন ১২০ প্রজাতির মাছ, ২৭০ প্রাজাতির পাখি, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৫ সরীসৃপ এবং ৮টি উভচর প্রজাতির আবাসস্থল।

-সুন্দরবন বাংলাদেশের বনজ সম্পদের একক বৃহত্তম উৎস।

-২০০৪ সালের জরীপে দেখা গেছে সুন্দরবনে ৫০০ রয়েল বেঙ্গল টাইগার আছে; ২০১১ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে এ সংখ্যা কমে ৩০০ তে এসে দাড়িয়েছে।

-সুন্দরবন ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

-স্থানীয়দের অধিকাংশই মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। প্রায় ১৩ ধরনের পদ্ধতিতে মাছ ধরা হয় এখানে।

-সুন্দরবনের নদী-নালা ও অন্যান্য জলাশয়ে ৪০০ প্রজাতির মাছ রয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতিগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০ প্রজাতির চিংড়ি, ৮ প্রজাতির লবস্টার, ৭ প্রজাতির কাঁকড়া, কয়েক প্রজাতির শামুক ও ৬ প্রজাতির ঝিনুক।

-সুন্দরবনের সবচেয়ে পরিচিত মাছ হলো পারশে মাছ।

- বলেশ্বর, কুঙ্গা নদীতে যথেষ্ট ইলিশ ধরা পড়ে।

-বাঘের আক্রমণে এই অঞ্চলে প্রতি বছর ১০০-২৫০ জন মানুষের মৃত্যু হয়।

-এই বন ঘিরে গরে উঠা ১৭টি খাত থেকে বছরে প্রায় ৭ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে সরকার।

Comments

Popular posts from this blog

How strong is Myanmar's military?

বিমান দুর্ঘটনা

পঁচাত্তরের নভেম্বরঃ নাগরদোলায় অনৈক্য,বিভক্তি ও সংঘাত (প্রথম পর্ব)