মায়ানমারে বিনিয়োগের ঝুঁকি

মায়ানমারের প্রতি সকলের আগ্রহ এখন তুঙ্গে। আমেরিকার সাথে দেশটি লেনাদেনা শুরু করেছে। মায়ানমারের রাষ্ট্রপতি থেইন সেইন কিছুদিন আগে প্রথম বারের মত হোয়াইট হাউসে সফরে যান। ওবামা প্রশাসন তাকে যথেষ্ট খাতির করেছে। অপরদিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুন, ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং সহ অনেক রাষ্ট্রপ্রধানগণ গত দুই বছরে ইয়াঙ্গুন সফর করেছেন।  

এখন পৃথিবীর নানা প্রান্তের বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের সঠিক ক্ষেত্র খুঁজে চলেছে মায়ানমারে। অনেক দেশের সরকার পুনরায় সেখানে দূতাবাস কার্যক্রম শুরু করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বৈদেশিক বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাবেক মন্ত্রীরা মায়ানমার সরকারের advisors হিসাবে কাজ করে যাচ্ছেন দেশটিকে উন্নতির উদ্দেশ্যে। বিদ্যুৎ সরবরাহ, অবকাঠামো নির্মাণ আর শাসনকার্য পরিচালনার জন্য উপযুক্ত নেতৃত্ব সৃষ্টিও এই উন্নয়ন কার্যের অন্তর্ভুক্ত। সব চলছে দ্রুত গতিতে।

মায়ানমারের প্রতি সকলের আগ্রহ অবশ্য মোটেই বিস্ময়কর কিছু নয়। মায়ানমার এখনও একটি অব্যবহৃত বাজার। Capitalistic নজরে মায়ানমার এখনো virgin। কিন্তু ঝুঁকি রয়ে গেছে যেমন ঝুঁকি থাকে বন্য virgin কে বাগে আনায়। মায়ানমারে যেকোনো মুহূর্তে বিনিয়োগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তন সহ শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজের ব্যাপারে বিনিয়োগকারীরা খানিকটা চিন্তিত কারণ অর্থনৈতিক সক্ষমতা নির্ণয়য়ের প্রধান উৎস জনসংখ্যা এবং অর্থনৈতিক উন্নতি এখানে এখনো কিছুটা অনিশ্চিত। প্রকৃতপক্ষে মায়ানমার বিংশ শতাব্দীর বৃহদায়তন অর্থনৈতিক উন্নতির সাথে তেমন পরিচিত নয়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেখানে এগিয়ে চলেছে সেখানে মায়ানমারের অর্থনীতিতে দুই যুগেরও অধিক সময় বিরাজ করেছে শীতল অবস্থা। আবার মায়ানমারের জাতীয় আয় বেশ কম। একজন লোক সারা বছর কাজ করে গড়ে ১৫০০ মার্কিন ডলার আয় করে, যা এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ কম। মায়ানমারের জিডিপি পুরো এশিয়ার অর্থনীতির তুলনায় মাত্র ০.২ শতাংশ।    

কাঙ্খিত উন্নতি সাধনে মায়ানমারকে এই অর্থনৈতিক অবস্থাকে ভিন্ন ভাবে মোকাবেলা করতে হবে। শ্রমিকদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে হবে আনেকাংশে। শ্রমিকদের দ্বারা যদি উৎপাদন ক্ষমতা ২.৭ থেকে ৭ শতাংশে বাড়ানো যায় তাহলে এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন চায়না,থাইল্যান্ড এর মত মোটামুটি ৮ শতাংশ জিডিপি অর্জন করতে পারবে। পাশাপাশি, বার্ষিক ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (২০১৩) থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার  আয় করা সম্ভব যা অর্থনীতিকে সুদৃঢ় অবস্থানে পৌঁছে দিবে। আর অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ ছাড়া মায়ানমারের পক্ষে ত্বরিত উন্নতি সম্ভব না। এখন পর্যন্ত বিনিয়োগকারীদের একটি বড় আকর্ষণের জায়গা হয়ে রয়েছে মায়ানমারের জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ খাত, কেননা  মায়ানমারের রয়েছে তেল ও গ্যাস সহ বিভিন্ন খনিজের বিশাল ভাণ্ডার। জ্বালানী ও খনিজ, কৃষি, শিল্পায়ন, পর্যটন ও অবকাঠামো- এই ৫টি খাত মায়ানমারের মোট প্রবৃদ্ধির ৯০% বহন করে। তবে মায়ানমারকে শুধুই জ্বালানী শক্তি ও খনিজের ওপর নির্ভরশীল হলেই চলবে না। উন্নতি ও প্রবৃদ্ধি সকল খাতে সমানভাবে বিভক্ত হওয়া উচিৎ যাতে আন্তঃবিনিয়োগ উৎসাহিত হয়।

অবকাঠামো নির্মাণে মায়ানমারের এখনো আনুমানিক ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন যার অর্ধেক নগর এলাকায় ব্যয় করা যায়। নগর উন্নয়ন প্রয়োজন কারণ ২০৩০ সালের মধ্যে নগরবাসীর সংখ্যা ১০ মিলিয়ন হবে বলে ধারনা করা হচ্ছে। এছাড়া টেলিযোগাযোগ খাতে আরও ৫০বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন কারণ এতে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার ঘটবে এবং বিভিন্ন ই-সেবা, যেমনঃমোবাইল ব্যাংকিং ও ই-বাণিজ্যের প্রচলনের ফলে বিভিন্ন খাতের সেবা গ্রামাঞ্চলেও পৌঁছানো যাবে। বিশ্বব্যাংকের উন্নয়ন সূচকের হিসাব অনুযায়ী মায়ানমারের ইন্টারনেট প্রসার দ্বিতীয় সর্বনিম্ন এবং মোবাইল যোগাযোগ সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান করছে। অর্থনীতিক উন্নতি সাধনে এই খাতের অগ্রগতি প্রয়োজন।

বাংলাদেশের বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত হবে এখনি মায়ানমারের বাজারে ঢুকে যাবার। বাংলাদেশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বেশ কিছু regional advantage আছে মায়ানমারের বাজারে ভালো করার প্রেক্ষিতে। প্রয়োজন যথাযথ strategy নিরুপন এবং সুচারু বাস্তবায়ন।

Comments

Popular posts from this blog

How strong is Myanmar's military?

বিমান দুর্ঘটনা

পঁচাত্তরের নভেম্বরঃ নাগরদোলায় অনৈক্য,বিভক্তি ও সংঘাত (প্রথম পর্ব)