পঁচাত্তরের নভেম্বরঃ বেতারকেন্দ্রের জৌলুস, ভূপাতিত দ্বিতীয় বিপ্লব এবং গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিতে একটি দাফন (চতুর্থ পর্ব)

(ক্রমশ...)

৩৯
বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে যেকোন অভ্যূত্থানে রেডিও ষ্টেশনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের ধারাবাহিকতায় ৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় রেডিও বাংলাদেশের বিল্ডিংয়ে মঞ্চস্থ হয় ক্ষমতা কাড়াকাড়ির তাৎপর্যময় একটি পরিবেশনা যার মুল ভূমিকায় থাকেন কর্নেল আবু তাহের ও জেনারেল জিয়া আর সহভূমিকায় খন্দকার মোশতাক ও বিচারপতি সায়েম। ক্যান্টনমেন্টের উপর দখল হারিয়ে ফেললেও শাহবাগে অবস্থিত রেডিও ষ্টেশনের উপর তাহেরের পূর্ণ দখল রয়েছে কারন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্য ও গণবাহিনীর সদস্যরা অস্ত্র হাতে তখনো ষ্টেশনের ভেতরে বাইরে বিচরন করছে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল আমিনুল হক ও কর্নেল মইনুল হোসেনের সতর্কবানী অগাহ্য করে জেনারেল জিয়া আসেন রেডিও ষ্টেশনে; রেডিওতে ভাষন দেয়া তাকে সবসময়ই প্রবলভাবে টানে। তিনি পৌছালে বিপ্লবী সৈনিকরা তাকে ঘিরে ধরে। একে একে দাবিগুলো পড়ে শুনানো হয় তাকে। জিয়াকে দেখে  মনে হয় না তিনি বিন্দুমাত্র ঘাবড়ে গেছেন; একটা একটা দাবী শোনেন আর  মাথা নেড়ে নেড়ে ছোট ছোট মন্তব্য করেন।বেতনের কথা উঠলে বলেন “বেতনতো বাড়াতেই হবে তবে বেশি বাড়ালে দেশের অন্য লোক খাবে কি?” ব্যাটম্যান প্রথার কথা উঠলে বলেন "এটা বাতিল করা হবে।" রাজবন্দীদের মুক্তির কথা উঠলে বলেন “জলিল, রবকে আজকেই জেল থেকে মুক্তি দেবার ব্যবস্থা করা হবে।” পাশে থাকা তাহের একসময় বলেন "আপনি এই দাবীনামায় সই করে দিন।" জিয়া সাবলিল ভঙ্গিতে সই করে দেন তিন কপি দাবীনামায়।এক কপি নিজে রাখেন,এক কপি বিপ্লবী সৈনিকেরা নেয়, অন্য কপি তাহের পাঠিয়ে দেন রেডিও ও পত্রপত্রিকায় প্রচারের জন্য। জিয়া দৃপ্ত পায়ে ঢুকে যান রেডিও ষ্টেশনের ভেতরে। একে একে আরও উপস্থিত হন নতুন প্রেসিডেন্ট সায়েম ও প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট মোশতাক। সবাই ভাষন দেন জাতীর উদ্দেশ্যে। তাদের মধ্যে জিয়াই সবচেয়ে অনায়েস, সবচেয়ে স্বতস্ফূর্ত। নতুন প্রেসিডেন্ট সায়েম ভাষনে উল্লেখ করেন যে তিনি খন্দকার মোশতাকের ‘অনুরোধে’ তার মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করেছেন। মোশতাক তার ভাষনে বলেন দেশের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে তিনি বিচারপতি সায়েমের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করছেন। জিয়া তার ভাষণে বলেন আর্মি নতুন প্রেসিডেন্টের প্রতি অনুগত আছে এবং সৈনিকদের আনুরোধ করেন ব্যারাকে যেয়ে অস্ত্র জমা দিতে। কারও ভাষনেই সৈনিকদের দাবীনামাও কোন উল্লেখ নেই।

ভাষণ শেষে জিয়া রেডিও স্টেশনের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন সৈনিকদের দাবীনামা না প্রচার করার জন্য। সাথে সাথে উপস্থিত সরকারী কর্মচারীদের ডেকে বলেন এটা নিশ্চিত করতে কোন পত্রিকা যেন দাবীনামা না ছাপে।

৪০
রেডিওতে আর্মি চীফ জিয়াউর রহমানের এবং প্রেসিডেন্টের সায়েমের ভাষণ প্রচার হবার মাধ্যমে শেষ হয় নাগরদোলায় উত্থান ও পতনের অংক। জাসদ ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা বুঝে যায় যার ঘারে চড়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করার চেষ্টা করা হয়েছে সেই দেশের ঘারে চড়ে বসার ক্ষেত্র তৈরী করে ফেলেছে। তাহের জানতেন জিয়া ক্ষমতালোভী ও গভীর জলের মাছ তবে ভেবেছিলেন জিয়াকে কন্ট্রোল করতে পারবেন তিনি। কিন্তু জিয়া যে কত গভীর জলের মাছ তা তাহের বা জাসদ বুঝতে পারেনি।

প্রেসিডেন্ট এখন বিচারপতি সায়েম কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু বঙ্গভবন নয়। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন জিয়াউর রহমান। তাই জাসদ ঠিক করে ক্যান্টনমেন্টের সৈনিকদের আবার ক্ষেপিয়ে তুলতে হবে এবং এবার বিশ্বাসঘাতক জিয়াকেই উৎখাত করতে হবে। কাজটি কঠিন নয় কারন সৈনিকেরা এখনও অস্ত্র হাতে ঘুরে বেরাচ্ছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আবার বিলি করা হয় লিফলেট যেখানে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করা হয় জিয়া এবং অফিসার শ্রেণীকে। সৈনিকদের জানানো হয় ১২ দফা দাবি জিয়া বাস্তবায়ন করবেন না।এবারের শ্লোগান গতরাত থেকে ভিন্ন ও ভয়ংকর - অফিসারদের রক্ত চাই!

৪১
রাতে ক্যান্টনমেন্ট ছেয়ে যায় আতঙ্কে। এখানে সেখানে অস্ত্রকাধে সৈনিকদের জটলা। তারা অবজ্ঞাভরে অফিসারদের দিকে তাকাচ্ছে। বিপ্লবী সৈনিকদের মতিগতি সুবিধার না লাগাতে সাধারন সৈনিকরা তাদের ইউনিটের অফিসারদের উপদেশ দিলো ক্যান্টনমেন্টের বাইরে চলে যেতে। অনেক অফিসার গাড়ী করে, রিক্সা করে চলে গেলেন বাইরে। যাদের শহরে আত্মীয়-স্বজন নেই, তারা হোটেলে উঠে আত্মগোপন করলেন।

৪২
জিয়া পাকিস্তান আর্মিতে থাকাকালীন গোয়েন্দা সংস্থায় কাজ করেছেন বহুদিন। তার সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি নির্ণয় করলেন টু-ফিল্ড আর্টিলারি এখন আর  তার জন্য নিরাপদ নয়। যেকোন সময় হানা দিতে পারে প্রতিপক্ষ। তিনি চলে গেলেন আর্মি হেডকোয়ার্টারে। ফোর বেঙ্গলের কমান্ডিং অফিসার আমিনুল হককে দায়িত্ব দিলেন নিরাপত্তা বলয় তৈরী করতে। কর্নেল শাফায়েত জামিলের অনুপস্থিতিতে কর্নেল আমিনুল হক ৪৬ পদাতিক বিগ্রেডের কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করছেন। বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকরা সাড়া দেয়নি বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ডাকে। অত্যন্ত অনুগত এসব সৈনিকদের নিয়ে কর্নেল আমিনুল হক অবস্থান করলেন আর্মি হেডকোয়ার্টারে। জিয়া সেখানেই রাতটা কাটালেন।

৪৩
গভীর রাতে বেঙ্গল ল্যান্সারের কিছু ট্যাঙ্ক বেড়িয়ে পরে সুবেদার সারওয়ারের নির্দেশে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফারুক চলে যাবার পর থেকে সুবেদার সারওয়ারই ইউনিটের সর্বেসর্বা। ট্যাঙ্ক গিয়ে দাড়ালো ফোর বেঙ্গল ব্যাটেলিয়ানের সামনে। উদ্দেশ্য খালেদ মোশাররফের অনুগত মেজর নাসের ও মেজর গাফফারকে মুঠোয় নিয়ে হত্যা। ফোর বেঙ্গলের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট  কর্নেল আমিনুল হক অস্বীকার করলেন এই দুই মেজরকে বেঙ্গল ল্যান্সারের হাতে তুলে দিতে। আমিনুল হক উল্টো হুমকি দিলেন ট্যাঙ্ক না সরালে তিনি চুড়ান্ত ব্যবস্থা নিবেন। ট্যাঙ্ক বাহিনীর সদস্যরা আমিনুল হকের হুমকির তোপে পিছু হটলো।

৪৪
রাত ১২টার পর উচ্ছৃঙ্খল সৈনিকরা দল বেধে অফিসার্স কোয়ার্টারে হামলা চালায়। কণ্ঠে তাদের শ্লোগান “সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই।” একদল ঢুকে পড়ে কর্নেল শামসের বাসায়; বাসায় কাউকে না পেয়ে এলোপাথাড়ী গুলি চালায়। এরপর তারা হানা দেয় লেফটেন্যান্ট কর্নেল হামিদের বাসায়। ভেতরে ঢুকে হামিদকে খুজতে খুজতে বেডরুমের কাছে চলে আসে। কর্নেল হামিদের স্ত্রী রানী হামিদ এ সময় দরজা খুলে বেড়িয়ে আসেন। পেছনে আসেন হামিদ; জিজ্ঞেস করেন "তোমরা কি চাও?" একজন বিপ্লবি সৈনিক গুলি করার জন্য রাইফেল তুললে হামিদের অধিনস্ত সৈনিকরা তাকে জাপটে ধরে। হামিদের ব্যাটম্যান বলে "খবরদার ভালো হবে না কিন্তু।" হামিদের অধিনস্ত সৈনিকদের দৃঢ়তায় পিছু হটে বিপ্লবী সৈনিকরা। যাবার আগে বলে যায় "দাবী না মানলে আমরা কোন অফিসারকে জিন্দা রাখবো না।" ৪৬ ব্রিগেডের মেজর সাখাওয়াত ছিলেন হেডকোয়ার্টারে। রাত গভীর হলে নায়েক আজীম তাকে নিজের বাসায় নিয়ে যায়; রক্ষা পায় মেজর সাখাওয়াতের জীবন। এরকম বহু পরিস্থিতিতে সাধারন সৈনিকরা তাদের অফিসারদের রক্ষা করে। কিন্তু সব অফিসাররা এতো ভাগ্যবান নন। টিভি ভবনে তিনজন অফিসারকে হত্যা করা হয়। এক লেডি ডক্টর আর একজন ডেন্টাল সার্জনকে ব্যক্তিগত আক্রোশে হত্যা করা হয়। ক্যাপ্টেন আনোয়ার আর লেফটেন্যান্ট মোস্তাফিজ, যারা বাংলাদেশ হকি ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল, তাদেরকে টিভি স্টেশনের কাছে তাড়া করে নিয়ে হত্যা করা হয়। মোট ১২ জন অফিসার মারা যায় সৈনিকদের হাতে।  এসব হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় বেঙ্গল ল্যান্সারের সৈনিকরা, পাকিস্তান প্রত্যাগত সৈনিকরা ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যরা।

৪৫
রাতভর যত্রযত্র অফিসার হত্যা হবার পর পরিস্থিতি যতটুক নাজুক হবার কথা ৮ নভেম্বর সকালে ক্যান্টনমেন্টের পরিস্থিতি তার থেকেও বেশি নাজুক আকার ধারন করে।চেইন অব কমান্ড বলে কিছু থাকে না।কেউ কারও কথা শুনছে না; কেউ কারও কথা মানছে না। এতদিন চোখ নিচু করে কথা শোনা সৈনিকরা আজ চোখে চোখ রেখে কথা বলছে অফিসারদের। যেখানে দেখছে অফিসাররা ব্যাজ পরে এসেছে, ছুটে যেয়ে টেনে ব্যাজ খুলে ফেলছে।এ পরিস্থিতিতে অনেক অফিসার ক্যান্টনমেন্টের বাইরে চলে গেলেন।

তরুন ক্যাপ্টেন ফজলুর রহমান তখন ১০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি পদাতিক কোম্পানি কমান্ড করছে। কিছু সৈনিক ইউনিটের ভেতর এসে উগ্রমূর্তিতে তাকে বলে "আপনারা বুর্জোয়া সাম্রাজ্যবাদী সামন্ত প্রকৃতির। আমরা এখন থেকে নিজেরা সেনাবাহিনীর কমান্ড করব। আপনি ব্যাজ খুলে ফেলেন।" হতভম্ব ফজলুর রহমানকে বিপ্লবী সৈনিকরা আরও জ্ঞান দিলো "কমান্ডিং অফিসার বলতে এখন থেকে কেউ নেই। জেসিওরা এখন থেকে সেনাবাহিনীর বড় অফিসার হবেন।" ফজলুর রহমান ব্যাজ খুলে তার অফিসে যেয়ে বসলো। কিছুসময় পর সুবেদার খায়েরের নেতৃত্বে পাচ-ছয়জন সৈনিক অফিসে ঢুকে উচ্চৈঃস্বরে ‘আপনারা গাদ্দার’ বলে সাবমেশিনগান ক্যাপ্টেন ফজলুর রহমানের দিকে তাক করে। গুলি করার ঠীক আগ মুহূর্তে ইউনিটের আরেক সৈনিক সুবেদার নজরুল মাঝে এসে দাড়ায়। সে খায়েরের ধরা এসএমজির নল ধরে নীচে নামিয়ে বলে "খায়ের খবরদার, উনি আমার প্যারেন্ট অফিসার"।  সুবেদার নজরুলের সাথেও তখন অনেক সৈনিক। তারা খায়েরকে টেনে নিয়ে যায়। ক্যাপ্টেন ফজলুর রহমান এইসময় জিজ্ঞেস করে "খায়ের সাহেব, আমার বাবা আমাকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন, আমি আর্মি অফিসার হয়েছি। আপনি পারেননি। তাতে আমার দোষ কোথায়?" খায়েরের কাছে এর উত্তর নেই।

এদিকে জেনারেল জিয়া বিভিন্ন ইউনিটে যাবেন বলে মনস্থির করেন। প্রথমে যান ফোর বেঙ্গল রেজিমেন্ট গ্রাউন্ডে। সেখানে বহু সৈনিক জড়ো হয়েছে। বেঙ্গল রেজিমেন্ট ছাড়াও অন্যান্য কোরের সৈনিকরাও উপস্থিত সেখানে।জিয়ার উপস্থিতিতে কয়েকজন বিপ্লবী সৈনিক নেতা ভাষন দেয়।বহু দাবি তোলে তারা।জিয়া শোনেন সব।তারপর তার ভাষনে বলেন “আপনারা অস্ত্র জমা দিয়ে তাড়াতাড়ি ফিরে যান।আমি ব্যাটমান প্রথা তুলে দিয়েছি;বেতন বাড়ানোর ব্যবস্থা করছি।বাকি দাবি ক্রমান্বয়ে মেটানো হবে।” ভাষনের এক পর্যায়ে এক সৈনিকের বন্দুক থেকে ভুলবসত গুলি বেড়িয়ে যায়।ঘটনাস্থলেই মারা যায় দুজন।সুযোগের সৎব্যবহার করতে জিয়া কখনও ছাড়েন না; তিনি সৈনিকদের উদ্দেশ্য করে বলেন “দেখুন বিশৃঙ্খলা হলে কি অবস্থা হয়!আপনারা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনুন”।

৪৬
অন্যদিকে সুবেদার মাহবুব, যে সেন্ট্রাল অর্ডিন্যা্ন্স ডিপো দখল করে ৭ নভেম্বর মধ্যে রাতে বিদ্রোহের সূচনা করেছিল,কর্নেল আবু তাহেরের সাথে দেখা করার জন্য এলিফ্যান্ট রোডে যায় ৮ তারিখ দুপুরে। তাহের তখন টেলিফোনে কার সাথে যেন কথা বলছেন। এক সময় ধাম করে ফোনের রিসিভারটা রেখে তাহের বলে উঠলেন “বিট্রেয়ার”।সুবেদার মাহবুব তখন পাশে দাড়ানো; সে জিজ্ঞেস করে “কে স্যার”? তাহের উত্তর দেন জেনারেল জিয়া।এরপর তাহের মাহবুবকে বলেন “সুবেদার সাহেব একটা কাজ করেন!আপনি আপনার সুইসাইড কমান্ডিং ফোর্স তৈরী করেন।গাদ্দার জিয়াকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য”।সুবেদার মাহবুব এই নির্দেশ পালন করতে রাজি নয়।সে বলে “মোটেই সম্ভব না এটা!কি বলে সৈনিকদের একত্র করব এখন?” সে বেশ ক্ষুণ্ণ হয়েই বেরিয়ে আসে এলিফ্যান্ট রোডের বাড়ী থেকে।তাহের বুঝতে পারেন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার উপর থেকে তার কমান্ড হ্রাস পাচ্ছে।

৪৭
ওদিকে জেনারেল জিয়া তার কমান্ড প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে কর্নেল মইনুল হোসেন চৌধুরীকে বলেন টু ফিল্ড আর্টিলারি, আর্মি এমপি ইউনিট ও আর্মি হেডকোয়ার্টার সৈনিকদের বিশেষ করে সুবেদার মেজরদের আনুগত্য পরীক্ষা করে দেখার জন্য। এই কর্নেল মইনুলই ৩ নভেম্বর জিয়ার বাসভবনে ঢুকে পড়েছিলেন ওয়ান বেঙ্গল সৈনিকদের প্রহরা ভেদ করে। তার সাহসের কমতি নেই। তিনি গ্যারিসনে ডাকেন এসব ইউনিটের সৈনিকদের। সবাই পৌছালে তিনি সশস্ত্র সৈনিকদের অনুরোধ করেন অস্ত্র ও গোলাবারুদ বাইরে রেখে আসতে। খানিকটা বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় তবে অফিসারের হুকুম মানার সেই পুরোনো অভ্যাস জয়ী হয় আরও  একবার। সৈনিকরা ফেরত আসলে কর্নেল মইনুল ধীরস্থিরভাবে সৈনিকদের বুঝিয়ে বলেন আর্মি একটি কঠিন নিয়মতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং নিয়ম মেনে চলায় এই বাহিনীর মুল কথা।এরপর তিনি বলেন জেনারেল জিয়া পুনরায় চীফ অব আর্মি স্টাফের দায়িত্ব যখন নিয়েছেন সব দাবী বিবেচনা করা হবে।কর্নেল মইনুল জোর দেন বিশৃঙ্খলা সরিয়ে আর্মিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার। অধিকাংশ সৈনিক তার ভাষনের অর্ন্তনিহিত তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারে। সৈনিকরা শান্ত হলে কর্নেল মইনুল জেনারেল জিয়াকে নিয়ে আসেন। জিয়া সৈনিকদের বলেন ব্যারাকে ফিরে যেতে এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে।

৪৮
কর্নেল তাহের যখন ক্যান্টনমেন্টের পরিস্থিতি ঘোলাটে করে দিচ্ছেন এবং কমান্ড ষ্ট্রাকচার ভেঙ্গে দিচ্ছেন তার বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যদের দিয়ে তখন জিয়া চাললেন আরেকটি মোক্ষম চাল।তিনি পুলিশকে নির্দেশ দিলেন জাসদের উদ্যেগে বায়তুল মোকারম চত্বরে অনুষ্টিত সমাবেশ ভন্ডুল করে দিতে। পুলিশ সেখানে গুলি চালালে সমাবেশ ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।জাসদ আরেকবার ব্যর্থ হয় জনতাকে তাদের অভ্যুত্থানের সাথে টানতে। জনতা বরং বিভ্রান্ত;কে ক্ষমতায় আর কে নয় তা পরিস্কার হয় না।

৪৯
সারাদিন কর্নেল মইনুল হোসেন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল হামিদ,লেফটেন্যান্ট কর্নেল আমিনুল হক অক্লান্ত পরিশ্রম করেন কমান্ড ষ্ট্রাকচার ফিরিয়ে আনতে। তারা প্রতিটি ইউনিট ঘুরে ঘুরে সৈনিকদের বুঝালেন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ১২ দফাদাবীর আসাড়তা। তারা সৈনিকদের বুঝিয়ে বললেন আর্মিকে হঠাৎ করে পূর্ণগঠন করা যাবে না।তবে তারা কিছু কিছু দাবীর প্রতি সহমর্মিতা জানিয়ে আশ্বাস দিলেন জেনারেল জিয়াকে তারাই এসব মেটানোর অনুরোধ করবেন। একই সাথে সৈনিকদের নির্দেশ দিলেন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার উস্কানিকে না কান দিতে।

৫০
আর্মি হেডকোয়ার্টার ৯ নভেম্বর সকালে অনেক সংগঠিত, শক্তিশালী। যশোর থেকে কর্নেল সালাম তার কমান্ডো ইউনিট নিয়ে আসে পৌছেছেন। আর্মি হেডকোয়ার্টার ঘিরে রেখেছে তার কমান্ডোরা। বেঙ্গল লান্সারস বা টু ফিল্ড থেকে আচমকা আক্রমন এখন প্রতিহত করা যাবে অনায়েসে। এরমধ্যেই প্রেসিডেন্ট সায়েম কর্তৃক আদেশ জারী হয়েছে যে জেনারেল জিয়ায় ৩ নভেম্বর দেয়া চীফ অফ আর্মি স্টাফ পদ থেকে অব্যাহতি চেয়ে পদত্যাগ পত্রটি বাতিল গন্য হবে। এ আদেশজারীর বিশেষ তাৎপর্য হলো, এর ফলে খালেদ মোশাররফের চীফ অফ আর্মি স্টাফ হওয়াটিও বাতিল হয়ে গেলো। সকালেই অনেক অফিসার উপস্থিত হন আর্মি হেডকোয়ার্টারে।  শহর থেকেও আসেন অনেকে; কেউ কেউ সিভিল ড্রেসে। জিয়া তাদের বলেন ‘ডোন্ট রান আওয়ে লাইক কাওয়ার্ডস। ইফ ইউ রান আওয়ে, দে উইল চেইস ইউ। বিহ্যাভ লাইক অফিসারস অ্যান্ড সেইভ দ্যা নেশন।”

৫১
লেফটেন্যান্ট কর্নেল আমিনুল হক এর মধ্যেই বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার হোতাদের মার্ক করে করে এরেস্ট করে ফেলেন। তাতে ‘অফিসারবিহীন’ আর্মির উস্কানি বন্ধ হয়ে যায়। এখন কাজ একটাই বাকী; উত্তেজিত সৈনিকদের শান্ত করা। জেনারেল জিয়া মিটিং করতে থাকেন হাবিলদার ও সুবেদার মেজরদের সাথে। তাদের বলেন কোন অফিসারকে হত্যা করার আগে তাকে প্রথমে হত্যা করতে হবে। এক মিটিংয়ে তাকে ‘জনাব জিয়াউর রহমান’ বলে এক সৈনিক নেতা সম্বোধন করলে জিয়া উত্তেজিত হলে বলেন “আই এ্যাম নট ব্লাডি জনাব জিয়াউর রহমান; আই এ্যাম জেনারেল জিয়া।” সৈনিকরা বুঝে নিল তাওয়ার কোন দিক গরম বেশী। অন্য এক সমাবেশে, যেখানে বেঙ্গল লান্সারসের সৈনিকরা সংখ্যায় বেশী ছিলো, হৈ হট্টোগোল বেশী হলে জিয়া তার ইউনিফর্মের বেল্ট খুলে ছুড়ে ফেলেন, তারপর বলেন “আপনারা আমার কথা শুনছেন না, আমি আপনাদের চীফ থাকবো না।” নাটের গুরু সারওয়ার এসে বেল্ট তুলে দেয় জিয়াকে। প্রতিজ্ঞা করে নির্দেশ পালন করবে। অন্য এক সমাবেশে জিয়া কোরআন শরীফ আনেন। সৈনিক নেতাদের বলেন কোরআন শরীফ ছুয়ে প্রতিজ্ঞা করতে। তিনি নিজেও কোরআন ছুয়ে প্রতিজ্ঞা করেন ইলেকশন দেবেন ৯০ দিনের মধ্যে। সুবেদার মেজর আনিসকে কাজে লাগান জিয়া। আনিস প্রথম থেকেই জিয়ার প্রতি বিশ্বস্ত। সুবেদার মেজর আনিস অন্য ইউনিটের সৈনিকদের বুঝান জিয়া একে একে দাবী মেনে নেবেন তবে সময় লাগবে। এসবের ফলে ক্যান্টনমেন্টের পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে; কর্নেল আবু তাহেরের অবস্থান দুর্বল হতে থাকে। তার জিয়াকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করার ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ ও প্রথমটির মতন ভূপাতিত হয়।


৫২ (শেষ অধ্যায়)
স্টেশন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল হামিদ একটা ফোন পান ৯ নভেম্বর দুপুরে। ফোন করেছেন খালেদ মোশাররফের চাচা। হামিদকে তিনি অনুরোধ করেন খালেদের লাশটি তাদের কাছে হস্তান্তর করার জন্য। লেফটেন্যান্ট কর্নেল হামিদ তাকে সহায়তার আশ্বাস দেন এবং বলেন সিএমএইচ আসতে। খালেদ মোশাররফের আত্মীয়রা তাতে রাজী হলেন না। কর্নেল হামিদ বোঝেন তাদের মনের অবস্থা; তিনি বলেন বনানী রেল স্টেশনের কাছে এসে লাশ নিয়ে যেতে। আত্মীয়রা জানতে চান সেনানিবাস গোরস্থানে দাফনের অনুমতি পাওয়া যাবে কিনা। লেফটেন্যান্ট কর্নেল হামিদ খালেদের অনেক সিনিয়ার অফিসার। ঘনিষ্ঠতা ছিল না তবে খালেদকে তার অত্যন্ত দক্ষ অফিসার মনে হতো। দেশ ও আর্মির প্রতি খালেদের আনুগত্য ও দেশের কল্যাণে তার একনিষ্ঠতা লেফটেন্যান্ট কর্নেল হামিদকে মুগ্ধ করতো। লেফটেন্যান্ট কর্নেল হামিদ এক মুহূর্ত চিন্তা করে বললেন সেনানিবাস গোরস্থানে দাফন করা যাবে খালেদের লাশ। এরপরও খালেদের আত্মীয়রা ইতস্তত করছিলেন। হামিদ তাদের আশ্বস্ত করে বলেন তিনি দাফন করার সময় উপস্থিত থাকবেন।

লাশ দাফন হয়েছিল সেদিনই সন্ধ্যায়। গুড়ি, গুড়ি বৃষ্টির মধ্যে পাচজন আত্মীয় সাদা চাদরে মুড়ে খালেদ মোশাররফকে নিয়ে আসেন সেনানিবাস গোরস্থানে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল হামিদ তার দেয়া কথা মতো এসেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের কফিন বাংলাদেশের পতাকা দিয়ে ঢেকে দেওয়া রেওয়াজ। এই বিপর্যস্ত সময়ে এই বীর মুক্তিযোদ্ধার শরীর না পেলো কফিন, না পেলো দেশের পতাকা। স্ট্রিট-লাইটের স্তিমিত আলোয় যতটুকু চোখেসয়, তার উপর নির্ভর করে উপস্থিত সবাই  বীর উত্তম ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফকে নামিয়ে দেন সাড়ে তিনহাত নীচে। এরপর তড়িঘড়ি করে মাটি চাপা দেন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচাইতে মানবিক অভ্যুত্থানকারীকে যিনি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান করার মূল্য দিয়েছেন নিজের জীবন দিয়ে।

সমাপ্ত

তথ্য সূত্রঃ
তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা
লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ  হামিদ

সৈনিকের হাতে কলম
নায়েক সুবেদার মাহবুবর রহমান

পঁচাত্তরের রক্তক্ষরণ
মেজর রফিকুল ইসলাম পিএসসি

জাসদের উত্থান পতনঃ অস্থির সময়ের রাজনীতি
মহিউদ্দিন আহমেদ

ক্রাচের কর্নেল
শাহাদুজ্জামান

এক  জেনারেলের নিরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক
মে.জে. মইনুল হোসেন চৌধুরী (অব.)

Bangladesh A Legacy of Blood
Anthony Mascarenhas

জিয়া ও নভেম্বর বিপ্লব
স্কোয়াড্রন লিডার (অব:) এ কে এম এনামুল হক
http://www.dailynayadiganta.com/?/detail/news/67641?m=0

খালেদ মোশাররফ, ‘আঁতাতকারী’ প্রসঙ্গ ও যুক্তির প্রয়োজনীয়তা
নাদির জুনাইদ

ইতিহাসের নিরেট বাস্তবতায় নভেম্বর ১৯৭৫
ববি_জি
http://www.bdface.net/blog/blogdetail/detail/4950/bobezee/30496#.WB8qv9J96Ul

তাহেরের স্বপ্ন (চতুর্থ পর্ব)
লিখেছেন: মো. আনোয়ার হোসেন
http://nirmanblog.com/anwarhossain/6164


Comments

Popular posts from this blog

How strong is Myanmar's military?

বিমান দুর্ঘটনা

পঁচাত্তরের নভেম্বরঃ নাগরদোলায় অনৈক্য,বিভক্তি ও সংঘাত (প্রথম পর্ব)