পঁচাত্তরের নভেম্বরঃ নাগরদোলায় উত্থান, পতন ও অবস্থান (তৃতীয় পর্ব)

(ক্রমশ...)

২৪
...এলো ‘জিরো আওয়ার’, ৭ নভেম্বর, ১৯৭৫। শুরু হলো কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে বিপ্লব; খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের পাল্টা জবাব। সুবেদার মাহবুব কোন বাধা ছাড়াই সেন্ট্রাল অর্ডিন্যান্স ডিপো দখল নেয়;  খুলে দেয় আস্ত্রাগার; বিদ্রোহী সৈনিকরা তুলে নেয় অস্ত্র। এরপর সে মুল রাস্তায় এসে আকাশে গুলি ছোড়ে,এটাই বিপ্লব শুরুর গ্রীন সিগন্যাল। বাকি দলগুলো বুঝে নেয় শুরু হয়ে গেছে সিপাহী বিদ্রোহ। একটা দল দ্রুত আর্মি হেডকোয়ার্টার দখল নেয়। অন্য একটা দল কোয়ার্টার থেকে, মেস থেকে অফিসারদের অস্ত্রের মুখে তুলে আনতে শুরু করে; তারা অফিসারদের বলে “আজ  থেকে সেপাই আর অফিসারের মধ্যে কোন পার্থক্য নাই, আমরা সব সমান।” বিস্মিত অফিসাররা নির্বাক হয়ে থাকাই শ্রেয় মনে করেন। শত শত সৈনিক রাস্তায় নেমে আসে। তাদের মুখে শ্লোগান ‘সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই’, ‘হাবিলদারের উপর অফিসার নাই’।

সারা ক্যান্টনমেন্ট জুড়ে তখন দ্রুতগতিতে ছুটে চলা ট্রাকের শা শা ও ট্যাঙ্কের ঘড়ঘড়ানির শব্দ।

২৫
খালেদ মোশাররফ তখন বঙ্গভবনে মিটিং করছেন। মিটিংয়ের বিষয়বস্তু কে  হবেন চিফ মার্শাল ল’ এডমিনিস্ট্রেটর। খালেদ মোশাররফ চান আর্মি চীফেরই চিফ মার্শাল ল’ এডমিনিস্ট্রেটর (CMLA) হওয়া বাঞ্ছনীয়। বিমানবাহিনী প্রধান ও নৌবাহিনী প্রধান চান প্রেসিডেন্ট আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম থাকবেন CMLA এবং তিনবাহিনী প্রধান হবেন ডেপুটি চিফ মার্শাল ল’ এডমিনিস্ট্রেটর (DCMLA)। সাথের অফিসাররা মার্শাল ল’র আইনকানুন ঘাটাঘাটি করে খালেদকে অনুরোধ করে “স্যার, প্রেসিডেন্টই CMLA থাকুক। তা না হলে  ট্যাকনিকাল সমস্যা হবে।”  খালেদ মেনে নেন সবার আর্জি; বলেন “ওকে ওকে, তাই হোক। তোমরা সবাই বেশী বোঝো!” রাত সাড়ে ১২ টা নাগাদ ক্যান্টনমেন্ট থেকে ফোন আসে সিপাহী বিদ্রোহের খবর নিয়ে। সবাই আবাক; অনেক সৈনিক অসন্তুষ্ট হয়ে রয়েছে তারা জানেন কিন্তু বিদ্রোহ! খালেদ মোশাররফ তিন নভেম্বর থেকে অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন কিন্তু সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা গুলোকে একদম কাজে লাগাননি তাই কর্নেল তাহের ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার কার্যকলাপের ব্যাপ্তি তার অজানা। কর্নেল গাফফার তার স্ত্রীকে ফোন করে জানতে পারেন সৈনিকরা সব রাস্তায় নেমে এসেছে এবং জিয়ার পক্ষে শ্লোগান দিচ্ছে। বিপদ আচ করে সাথে সাথে মিটিং ভেংগে দেন খালেদ। এরপর কর্ণেল নাজমুল হুদা এবং লেফট্যানেন্ট কর্নেল  হায়দারকে সাথে নিয়ে তার প্রাইভেট গাড়ীতে করে বঙ্গভবন ছেড়ে যান। নৌ ও বিমান বাহিনী প্রধানরাও যার যার বাসভবনে চলে যান। শুধু কর্নেল শাফায়াত জামিল রয়ে যান বঙ্গভবনে।

খালেদ প্রথমে যান রক্ষীবাহিনী প্রধান ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামানের বাসায়। সেখান থেকে ফোর বেঙ্গলে ফোন করলে তরুন অফিসার লেফটেন্যান্ট কামরুল জানায় সৈনিকরা সব অস্ত্র হাতে বেরিয়ে গেছে এবং বিভিন্ন শ্লোগান দিচ্ছে। খালেদ সিদ্ধান্ত নেন ফোর বেঙ্গলে যাবেন না। কর্ণেল হুদার সাথে আলোচনা করে শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত টেন বেঙ্গল রেজিমেন্টে আশ্রয় গ্রহন করবেন মনস্থির করেন। ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামান খালেদকে খাকি ড্রেস পাল্টিয়ে নিতে অনুরোধ করেন এবং নিজের একটি প্যান্ট ও শার্ট পরতে দেন।

বিপ্লবের প্রথম ধাক্কায়ই খালেদ মোশাররফ নাগরদোলা থেকে নেমে যান।

২৬
হাবিলদার আব্দুল হাই বা বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার অন্য কোন দল জেনারেল জিয়াউর রহমানের  ৬ নং মইনুল রোডের বাসায়  পৌছাবার  আগে টু-ফিল্ড আর্টিলারির সুবেদার মেজর আনিস ও মেজর মহিউদ্দীন তাদের দল নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়। চারিদিকে তখন ফায়ারিং চলছে। “জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ, সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই” শ্লোগান শুনে জিয়াকে গৃহবন্দী করে রাখা ফার্স্ট বেঙ্গলের গার্ডরা সব অবস্থান ছেড়ে পালিয়ে যায়। গেইটের কাছে এসে মেজর মহিউদ্দীন সৈনিকদের বলে আকাশে গুলি ছুড়তে; যদি ভেতর থেকে পাল্টা গুলি আসে তবে তা প্রতিহত করতে হবে আর যদি পাল্টা গুলি না আসে তবে বুঝতে হবে ভেতরে আস্ত্রধারী কেউ নেই। সৈনিকরা গুলি ছুড়ে অপেক্ষা করে, কোন পাল্টা গুলি আসলো না। এবার সৈনিকরা অতি দ্রুততার সাথে রাইফেলের বাট দিয়ে গেইটের তালা ভেঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করে। জিয়ার ড্রাইভার বেড়িয়ে এসে তাদের বাসার পেছনের দিকে নিয়ে যায়। সেখানে তারা চিৎকার করতে থাকে দরজা খোলার। জেনারেল জিয়া সবসময়ই সাহসী মানুষ। এত গুলির শব্দ ও চিৎকার শুনে বিচলিত হলেন না; বেড়িয়ে এলেন। মেজর মহিউদ্দীন জিয়াকে বলে, “স্যার আমরা আপনাকে নিতে এসেছি।”জিয়া জানেন না কার নির্দেশে এরা এসেছে, জানেন না খালেদ মোশাররফ বা শাফায়েত জামিলের অবস্থান কি, জানেন না রশিদ-ফারুক-ডালিম এখন কোথায়, জানেন না আর্মি এই মুহূর্তে কার নির্দেশে চলছে। তিনি বলেন “আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।” সুবেদার মেজর আনিস ও অন্যান্য  সৈনিকরা তাকে নিয়ে যাবার জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করে। জিয়া বলেন “আমি রিটায়ার্ড করেছি। আমি কিছুর মধ্যে নাই। আমি কোথাও যাব না।”বাইরে বড় রাস্তায় তখনো প্রচণ্ড গোলাগুলি চলছে। অন্যান্য দলগুলোও সামনে চলে এসেছে। উৎকণ্ঠিত মেজর মহিউদ্দীন আবার বলে “স্যার আমরা আপনাকে নিয়েই যাব। আমরা আপনাকে আবার চীফ বানাতে চাই। দোহাই আল্লাহর আপনি আসুন।” জিয়া এটা জানেন এই মহিউদ্দীন  রশিদ-ফারুক-ডালিম গংয়ের লোক। তবে কি রশিদ-ফারুক-ডালিম খালেদ মোশাররফকে সরিয়ে দিয়েছে? ‘আবার চীফ বানাতে চাই’ কথাটা শুনে জিয়া দ্রুত অনুমান করে নেন পাশার দান হয়তো ঘুরে গেছে, তার পক্ষের লোকেরা হয়তো খালেদের বিরুদ্ধে পাল্টা অভ্যুত্থান করেছে। দ্রুততার সাথে সঠিক অনুমান করায় জিয়া পারদর্শী। জিয়া যেই একপা এগিয়ে আসেন, সাথে সাথে সৈনিকরা তাকে চ্যাংদোলা করে কাধে উঠিয়ে নেয়। মুহূর্তের মধ্যে তাকে জীপে নিয়ে উঠায়। এর মধ্যে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যরা, বেঙ্গল লান্সারসের সৈনিকরা এবং অন্যান্য ইউনিটের ছোট ছোট দলগুলো এসে পৌছেছে। জিয়াকে মুক্ত দেখে তাদের আনন্দের সীমা নেই। সবাই মিলে জিয়াকে বহনকারী জীপটি ঠেলে নিয়ে চললো টু-ফিল্ড আর্টিলারির দিকে। আকাশ বাতাস কাপিয়ে শ্লোগান উঠলো, ‘আল্লাহু আকবর’, ‘জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’, ‘সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই’, ‘জেনারেল জিয়া লাল সালাম’- ডানপন্থী বামপন্থী শ্লোগান মিলেমিশে একাকার!

সৈনিক পরিবেষ্টিত জিয়া এসে পৌছালেন টু-ফিল্ড আর্টিলারিতে। এই রেজিমেন্ট ১৫ই আগস্ট কর্নেল রশিদের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। শত শত সৈনিকদের পদভারে টু-ফিল্ড আর্টিলারি তখন প্রকম্পিত। হাবিলদার আব্দুল হাই সহ বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যরাও এসে উপস্থিত হয়েছে এখানে। তারা জিয়াকে জানায়, দেশে সিপাহী  বিপ্লব শুরু হয়েছে। তারা আরও জানায় কর্নেল আবু তাহের হলেন তাদের নেতা। জিয়া উপলব্ধি করলেন কর্নেল তাহেরই ঘটিয়েছেন খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে এই অভ্যুত্থান। তাহেরের সাথে তার সবসময় যোগাযোগ ছিল, তাহের আর্মি থেকে বেড়িয়ে যাবার পরও। তাহের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার কথা তাকে আকারে ইঙ্গিতে জানিয়েছেন। জিয়া জড়িয়ে ধরলেন আব্দুল হাই সহ বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যদের। কৃতজ্ঞতা জানালেন তাকে মুক্ত করার জন্য। জিজ্ঞেস করলেন “তাহের কোথায়?” আব্দুল হাই বলে “স্যার, উনি এলিফ্যান্ট রোডে তার বড় ভাইয়ের বাসায় আছেন। আমাদেরকে বলেছেন আপনাকে সেখানে নিয়ে যেতে।” জিয়া মঈনুল রোডের খাচার বদলে এলিফ্যান্ট রোডের খাচায় ঢুকতে রাজী নন; তার বুঝতে অসুবিধা হয়না এলিফ্যান্ট রোডে গেলে তাহের তাকে ডিকটেইট করতে শুরু করবেন। জিয়া নাটকীয় ভঙ্গীতে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যদের বলেন “‘তাহের শুধু তোমাদের নেতা নয়, সে আমারও নেতা। সে ক্যান্টনমেন্টে এসে বিপ্লবের নেতৃত্ব দিলেই তো ভাল হয়। তাকে তোমরা এখানে নিয়ে আসো।” সৈনিকরা জিয়ার এ কথা কিছুটা দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে। কর্নেল তাহের স্পস্ট নির্দেশ দিয়েছেন জিয়াকে এলিফ্যান্ট রোডে নিয়ে যেতে।তাহের তাদের নেতা কিন্তু জিয়াও তো সেনাপ্রধান! ক্ষনিকের দ্বিধা ছাপিয়ে বহু বছরের হুকুম মানার অভ্যস্ততা উপরে উঠে আসে; নায়েক সিদ্দিকুর রহমান “জি স্যার! যাচ্ছি” বলে তিন ট্রাক সৈনিক, যার অধিকাংশ বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্য, নিয়ে রওনা হয় এ্যালিফ্যান্ট রোডে। জিয়া এবার ব্যাটেলিয়ান হেডকোয়ার্টারে ঢুকেন; দেখেন কিছু অফিসার গুমড়া মুখে বসে আছে; এদেরকে সৈনিকরা একটু আগে ধরে এনেছে। অফিসাররা জিয়াকে দেখে যতটা না স্বস্তি পান জিয়া তাদের দেখে তার থেকে বেশি স্বস্তি পান। এর মধ্যে এসে হাজির হয়েছেন ফোর বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল আমিনুল হক ও এডজুটেন্ট ক্যাপ্টেন মুনির।তাদের সাথে আছে একদল সৈনিক। বেঙ্গল রেজিমেন্ট পাশে রয়েছে দেখে আশ্বস্ত  হন জেনারেল জিয়া। লেফটেন্যান্ট কর্নেল আমিনুল হকও বিদ্রোহ শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই ক্যাপ্টেন মুনির ও কিছু সৈন্য নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন জিয়ার বাসায়।ততক্ষনে মেজর মহিউদ্দীন ও সুবেদার মেজর আনিস জিয়াকে উদ্ধার করে টু-ফিল্ড আর্টিলারির দিকে রওনা দিয়ে দিয়েছে।

টু-ফিল্ড আর্টিলারির হেডকোয়ার্টারে অফিসার পরিবেষ্টিত হয়ে জিয়া এতক্ষনে পরিস্থিতি বিশ্লেষনের সুযোগ পান। যে সব সৈনিক তার আশে পাশে আছে তাদের তিনি ভালভাবে লক্ষ্য করেন এবং নেতা গোছের হাবিলদারদের স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে নির্দেশ দেন আরও কয়েকজন অফিসারকে ডেকে আনার জন্য। সৈনিকরা ছুটে যায় অফিসারদের ডাকতে।মেজর মহিউদ্দীনও উঠে পরে। সে তার জীপ নিয়ে যায় ভিআইপি গেষ্টহাউজে। গেষ্ট হাউজে পৌছে ডিউটিরত সৈনিককে প্রশ্ন করে জানতে পারে একজন সিনিয়ার অফিসার একটু আগে এখানে ছিলেন কিন্তু গোলাগুলি শুরু হবার পর ভিআইপি গেষ্টহাউজের ঠিক পাশেই অবস্থিত কর্নেল এরশাদের বাসায় চলে গেছেন। মহিউদ্দীন ছুটে যায় এরশাদের বাসায়। সে বেল দেয়, ডাকাডাকি করে; কেউ দরজা খোলে না। মহিউদ্দীনের কি মনে হয়; সে সাথে থাকা সৈনিকদের নির্দেশ দেয় দরজার তালাটি ভেঙ্গে ফেলার।তালা ভেঙ্গে ফেলা হলে সে একটি একটি করে ঘর খুজতে থাকে। হাতে তার ষ্টেনগান। হাঠাৎ মহিউদ্দীন দেখে ষ্টোররুমের ভেতর একটি বক্সের ভেতরে কাচুমাচু করে কেউ একজন লুকিয়ে আছে।মহিউদ্দীন ষ্টেনগান উচু করে গর্জন দেয় “বেড়িয়ে আসেন।”বাক্সের পেছন থেকে বেড়িয়ে আসেন যশোর পদাতিক বিগ্রেডের ভীত সন্ত্রস্ত কমান্ডার মীর শওকত । মহিউদ্দীন বলে “আপনি লুকোচ্ছেন কেন?জেনারেল জিয়া এখন মুক্ত। তিনি আপনাদের ডেকেছেন।” বিগ্রেডিয়ার মীর শওকতের সাথে জিয়ার সম্পর্ক ভাল তবুও তিনি দ্বিধান্বিত, শঙ্কিত।মেজর মহিউদ্দীন এবার নির্দেশ দেয় “জীপে উঠে বসুন।”বিগ্রেডিয়ার মীর শওকত কম্পিত দেহে জীপে গিয়ে বসলেন। জীপ চলা শুরু করলে মীর শওকত বলে উঠলেন “আমি পেশাব করব। একটু থাম ভাই।” মহিউদ্দীন তখন মহা বিরক্ত।সে রাগত স্বরে বলে “পেশাব-টেশাব ওখানে গিয়ে করবেন। ওখানে ভাল পেশাবখানা আছে।”

টু-ফিল্ড আর্টিলারি হেডকোয়ার্টারে ততক্ষণে অনেক অফিসার জড়ো হয়েছেন। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সাথে যে সব সৈনিক সম্পর্কিত নন তারা স্বসম্মানে অফিসারদের ডেকে নিয়ে এসেছে আর বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সৈনিকরা অফিসারদের লাঞ্চিত ও হেনস্তা করে নিয়ে এসেছে। অফিসাররা বুঝতে পারে না জেনারেল জিয়ার মুক্তির সাথে হেনস্তা করার কি সম্পর্ক রয়েছে!

২৭
রাত একটার মধ্যে শাহবাগে অবস্থিত রেডিও ষ্টেশন বিনা বাধায় দখল নেয় কর্নেল তাহেরের অনুসারীরা।বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে যেকোন অভ্যুত্থানে রেডিও ষ্টেশন দখল নেয়া অত্যাবশ্যক। তাহের এ সময় আছেন এ্যালিফ্যান্ট রোডে নোয়াখালীর সমিতি নামে গলির ৩৩৬ নম্বর বাড়িতে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সেক্টর কমান্ডার থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি যুদ্ধে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতেন। তার সেই অত্যাধিক সাহস ও আত্মবিশ্বাস স্তম্ভিত করত সবাইকে। আজ ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের অভ্যুত্থানে তিনি ‘যুদ্ধাঞ্চল’ থেকে অনেক দুরে; এবার পুরো মাত্রায় নির্ভর করছেন তার সৈনিকদের উপর। তিনি আনন্দিত কারন একের পর এক ফোন আসছে অভ্যুত্থানের টার্গেট অর্জিত হচ্ছে খবর নিয়ে - আর্মি হেডকোয়ার্টার দখল হয়েছে, অফিসারদের ধরে এনে টু-ফিল্ড আর্টিলারিতে নেওয়া হচ্ছে, একদল রেডিও ষ্টেশন দখল করেছে, একটা দল গেছে জেনারেল জিয়াকে মুক্ত করতে। তাহের তার ছোট ভাই আনোয়ারকে, যে কিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন তরুন শিক্ষক, নির্দেশ দেন মাইকিং করে শহরের মানুষদের বিপ্লবের খবর জানাতে এবং কাল সকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও শহীদ মিনারে জনসভায় যোগদান করতে। তাহের মনে করেন তার অভ্যুত্থানটিকে শুধু সৈনিকদের মধ্যে আটকে রাখলে হবে না, জনসাধারনকে এর সাথে সম্পর্কিত করতে হবে।আনোয়ার এ দায়িত্ব গণবাহিনীর বাহার ও বেলালকে, যারাও কিনা তাহের ও আনোয়ারের আপন ভাই, বুঝিয়ে দেন। এ দুজন বেড়িয়ে পরে মাইকের খোজে। আনোয়ার ফোন করেন এবিএম মাহমুদের বাসায়। সেখানে আছেন জাসদের তাত্বিক নেতা সিরাজুল আলম খান। সিরাজুল আলম খান আনোয়ারকে রেডিওতে প্রচার করবার জন্য একটা বক্তব্য ন্যারেট করেন।আনোয়ার তা কাগজে লিখে ছোটেন রেডিও ষ্টেশনে। টেকনিশিয়ানকে দিয়ে চালু করা হয় প্রচার। ভেসে আসে ৭ই নভেম্বরের সিপাহী বিপ্লবের পক্ষে প্রথম রেডিও ঘোষণা “বাংলাদেশের বীর বিপ্লবী জনগণ, বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও গণবাহিনীর যৌথ নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর জোয়ানরা রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেছে।আপনারা শান্ত থাকুন...”। ঘোষণার কোথাও কর্নেল তাহেরের নাম নেই।

২৮
রাত দেড়টার দিকে নায়েক সিদ্দিকের নেতৃত্বে এক  ট্রাক সৈনিক গুলি ছুড়তে ছুড়তে এলিফ্যান্ট রোডে নোয়াখালীর সমিতির গলিতে তাহেরের কাছে আসে। ট্রাক থেকে নামতে না নামতেই তাহের তাদের জিজ্ঞাসা করলেন “জিয়া কোথায়?” উত্তরে সিদ্দিক বলে ‘স্যার আপনাকে এখনি ক্যান্টনমেন্ট যেতে হবে। জিয়াকে মুক্ত করেছি। কিন্তু তিনি আসেন নি। আপনাকে যেতে বলেছেন’। এটা শুনে তাহের উত্তেজিত হয়ে যান; গলা উচিয়ে বলেন  “তার মানে কি? তোমাদের না স্ট্রিক্টলি ইন্সট্রাকশন দিলাম জিয়াকে যেভাবে হোক, এখানে আনতে হবে!” বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যরা তাহেরের অগ্নিরুপ দেখে কাচুমাচু হয়ে যায়। একজন বলে “আমরা ভাবলাম উনিতো আপনারই লোক। উনি যখন বললেন তখন আমাদের তাই করা উচিত। ” তাহের শান্ত হন না, বলেন “তোমরা তো নিজের পায়ে কুড়াল মারলা। খেলা তো হাতের বাইরে চলে গেলো। ” তাহের বোঝেন বিপ্লবের কেন্দ্রটা ক্যান্টনমেন্টের বাইরে না আনতে পারাটা সাঙ্ঘাতিক ভুল হলো। কিছুক্ষণ পায়চারী করেন। উপস্থিত সবাই চুপ। এক সময় নীরবতা ভাঙ্গেন, বলেন “আমাদের এখনই ক্যান্টনমেন্টে যাওয়া দরকার।”

২৯
রাত দুইটার দিকে বেঙ্গল ল্যান্সারের একদল সৈনিক, যারা কর্নেল ফারুক দেশ থেকে চলে যাবার পর এতিম হয়ে পড়েছিল, ট্রাকে করে খন্দকার মোশতাকের আগামসী লেনের বাড়ীতে উপস্থিত হয়। বেঙ্গল ল্যান্সারের সৈনিক দেখে মোশতাকের পুনরায় পুকল জাগে।১৫ ই আগষ্ট ভোরে এরকমই একদল সৈনিক ট্যাংকে করে এসেছিল তাকে রেডিও ষ্টেশনে নিয়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করবার জন্য। আজ ট্যাংক আসেনি, ট্রাক এসেছে তবুও এই দেখে তার মন ভাল হয়। সৈনিকরা ট্রাক থেকে নেমে করে বলা শুরু করে “স্যার,সিপাহী বিদ্রোহ হয়েছে! খালেদ মোশাররফ বঙ্গভবন ছেড়ে পালিয়েছেন। জিয়াকে মুক্ত করা হয়েছে। আপনি আবার রাষ্ট্রপতি হবেন”। মোশাতাকের মনে হয় - আহা! আরেকবার সুযোগ এসেছে। তিনি তার বাসার কর্মচারীদের নির্দেশ দেন অতিদ্রুত এলাকার মাদ্রাসাগুলো থেকে ছাত্র নিয়ে এবং তার ছবি নিয়ে আসতে।এলাকার মাদ্রাসাগুলোতে তার দখল ভাল; সবাই তাকে মান্য করে। তার ছবি টাঙ্গানো থাকে প্রায় সব মাদ্রাসায়। কর্মচারীরা বেঙ্গল ল্যান্সার্সের কিছু সৈনিক নিয়ে ছোটে মাদ্রাসাগুলোয়। জোগাড় হয় ছবি, জোগাড় হয় বেশ কিছু ছাত্র। মোশতাক এদের উঠিয়ে দেন ট্রাকে। ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’; ‘খন্দকার মোশতাক জিন্দাবাদ’-স্লোগান তুলে ট্রাকগুলো রওনা হয় বিপ্লবের কেন্দ্রমুখে। মোশতাক এদের বিদায় করে ফোন করেন ঘনিষ্ট সহোযোগীদের; তার বাসায় যত দ্রুত সম্ভব আসতে বলেন। ফোন রেখে মোশতাক তার প্রিয় পোষাক আচকান বের করেন। টুপি বের করেন। এগুলো তার লাকি সিম্বল; এই পরেই তিনি বঙ্গবন্ধুর মৃতদেহের উপর দাড়িয়ে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন; এই পরেই তিনি আওয়ামী লীগের চার নেতাকে জেলের ভেতর হত্যা করবার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

৩০
খন্দকার মোশতাক যখন মঞ্ঝে রি-এন্ট্রির তোরজোর করছেন তখন নতুন পরিস্থিতিতে বিভ্রান্ত খালেদ মোশাররফ কলাবাগানে অবস্থিত এক আত্মীয়ের বাসা থেকে ফোন করেন ১০ বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাওয়াজেশকে। নাওয়াজেশের কাছে আশ্বাস পেয়ে তিনি রওনা দেন শেরেবাংলা নগরে। সেখানেই অবস্থান করছে ১০ বেঙ্গল রেজিমেন্ট। খালেদের পরনে বিগ্রেডিয়ার নুরুজ্জামানের দেয়া বুশ শার্ট। সাথে আছেন কর্নেল হুদা, লেফটেন্যান্ট কর্নেল হায়দার। আসাদ গেটের কাছে এসে তাদের গাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। সেখান থেকে হেটে খেজুরবাগান পার হয়ে তারা পৌছেন এমপি হোস্টেলে। গেইটে ডিউটিরত সৈনিকরা একজন অফিসারের নেতৃত্ব তাদের দেহ সার্চ করে এবং সাথে থাকা পিস্তল নিয়ে নেয়; তিন অফিসার এতে আপত্তি তোলেন না। তাদের নিয়ে বসানো হয় কমান্ডিং অফিসারের ঘরে।

৩১
তাহের টু-ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্টে পৌছান রাত আড়াইটায়। তার সাথে তার ভাই ইউসুফ ও হাসানুল হক ইনু। জেনারেল জিয়া তখন লেফটেন্যান্ট কর্নেল আমিনুল হক, কর্নেল মইনুল হোসেন চৌধুরী, কর্নেল নুরুদ্দিন, ব্রিগেডিয়ার মীর শওকত,  মেজর মহিউদ্দীন, মেজর মুনীর এবং সুবেদার মেজর আনিসদের নিয়ে কমান্ডিং অফিসারের কক্ষে আলোচনা করছেন। মুলত তিনি জেনে নিচ্ছিলেন গত চার দিনে কি কি হয়েছে, কে কি করেছে। তাহের ঘরে ঢুকলে জিয়া এগিয়ে আসেন। জিয়া ও তাহের উভয়ে একে অপরকে আলিঙ্গন করেন। জিয়া বেশ আবেগ নিয়ে বলেন "তাহের ইউ সেভড মাই লাইফ। থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ।" উপস্থিত অফিসারদের কেউ কেউ অবাক হয় এই অবসর প্রাপ্ত কর্নেলকে এখানে দেখে। তারা বুঝতে পারে না জিয়া কেন তাকে ধন্যবাদ দিচ্ছেন। জিয়ার আবেগ তাহেরকে ছোয় না; তিনি ঘরে উপস্থিত অফিসারদের এক নজর দেখে জিয়াকে বলেন “আপনার সাথে আমার জরুরি কথা আছে।" জিয়া তাহেরের উত্তেজনা ধরতে পারেন। ঘরের একটু নিভৃত কোনে যান তারা। তাহের জিয়াকে সংক্ষেপে বিপ্লবের পট অবহিত করেন এবং বলেন তিনি চান একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হোক। জিয়া চুপচাপ শুনতে থাকেন তাহেরের কথা। এর মধ্যে এক জুনিয়ার অফিসার এসে জানায় বঙ্গভবনে কর্নেল শাফায়াত জামিলের সাথে ফোনে সংযোগ করা গেছে। জিয়া এসে ফোন ধরেন। জিয়া শাফায়াত জামিলকে বলেন "ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট, লেটস ইউনাইট দ্যা আর্মি"। শাফায়াতের ধারণা, জিয়া ঘটিয়েছেন  অভ্যুত্থান; তিনি বলেন, “আপনি কিছু করবেন স্যার তো অফিসারদের নিয়ে করেন, এসব জোয়ানদের নিয়ে করতে গেলেন কেন?” শাফায়াত তখন ক্ষুব্ধ। জিয়া শাফায়াতকে শান্ত হতে বলেন এবং সেখানে উপস্থিত তাহেরের সাথে কথা বলতে বলেন। এবার শাফায়াতের হতবাক হবার পালা। তিনি বুঝতে পারেন না অবসর প্রাপ্ত কর্নেল তাহের এর মাঝে কোথা থেকে এলেন। তাহের ফোন ধরে শাফায়াতকে বলেন “জাস্ট কোয়ায়েটলি সারেন্ডার। ভয় পাওয়ার কিছু নেই।” শাফায়াত তার মেজাজি স্বভাবে জানিয়ে দিলেন তিনি সৈনিকদের কাছে সারেন্ডার করবেন না।  শাফায়াত ফোন রেখে দিলে তাহের ও জিয়া আবার আলোচনায় বসেন। এবার করিডরে তাদেরকে দুটো চেয়ার দেয়া হয়। তাহের জিয়াকে একে একে কয়েকটি প্রস্তাব দেন; দেশের বিভিন্ন কারাগারে অন্তরীণ বন্দীদের মুক্তির নির্দেশ দিতে হবে, একটি অন্তবর্তীকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠন করতে হবে, সৈনিকদের সকল দাবী মেনে নিতে হবে, শহীদ মিনারে ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনতার উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখতে হবে। জনতার উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখার প্রস্তাবে জিয়া বেকে বসেন, বলেন “আমি জনসভায় ভাষণ দিতে পারবো না। ভাষন তুমিই দাও, সেখানে আমাকে নিয়ে টানাটানি করো না। ” তাহের জোরাজুরি করলে জিয়া যুক্তি দেন “তুমি সেনাবাহিনীতে নেই, কিন্তু আমি সেনাবাহিনীতেই আছি। শহীদ মিনারে তুমি ভাষণ দিতে পার, আমার পক্ষে তা সম্ভব নয়।” আবহাওয়া একটু উত্তপ্ত হয়; তাহেরের গলার স্বর একটু উচু হয় কিন্তু জিয়া তার অবস্থানে স্থির থাকেন, বলেন “আইএম নট গোয়িং আউট অব দিস ক্যান্টনমেন্ট।” এই সময় আবার ফোন আসে। এবার ফোন করেছেন ১০ বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার কর্নেল নওয়াজিশ। নওয়াজিশ, যিনি খালেদের বিশ্বস্ত অফিসার, ইতিমধ্যে জেনে গেছেন জেনারেল জিয়া মুক্ত এবং সব সিনিয়ার অফিসাররা তার সাথে টু-ফিল্ড আর্টিলারিতে আছেন। নওয়াজিশ জিয়াকে জানান খালেদ মোশাররফ, কর্নেল নাজমুল হুদা এবং লেফট্যানেন্ট কর্ণেল হায়দার তার ইউনিটে অবস্থান করছেন। পাশে থাকা তাহেরও শোনেন তা। জিয়া ফোন রেখে দিলে তাহের প্রশ্ন করে নিশ্চিত হন খালেদ মোশাররফ এখন কোথায় আছেন। এরপর তিনি ঘর থেকে বেড়িয়ে যান।

ওদিকে ফোন রেখে বঙ্গভবনে থাকা শাফায়েত জামিল টের পান ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’; ‘খন্দকার মোশতাক জিন্দাবাদ’ স্লোগান তুলে তুলে অজস্র আস্ত্রধারী সৈনিক প্রাঙ্গণে ঢুকে পড়েছে। শাফায়েত জামিল পেছনের দেয়াল টপকে বঙ্গভবনের বাইরে চলে যান, তথা নাগরদোলা থেকে নেমে যান। দেয়াল টপকাবার সময় তার পা ভেঙ্গে যায়।

৩২
টু-ফিল্ড আর্টিলারির প্রান্তর তখন সৈনিক ও অফিসারদের পদচারনায় উত্তাল যদিও সৈনিক ও অফিসার সম্পর্ক অনেকটাই অমীমাংসিত। কোন কোন সৈনিক অফিসারদের গোনায় ধরছে না, আবার কোন কোন সৈনিক মেনে চলছে পূর্ণ সামরিক শিষ্টাচার।

কিছুক্ষণ পর তাহের ফিরে এসে জিয়াকে বলেন “আপনি বক্তৃতা না করতে চাইলে অন্তত রেডিওতে একটা বক্তব্য রাখেন। আমাদের সঙ্গে চলেন রেডিও স্টেশনে।” জিয়া উত্তর দেবার আগেই তাদের মাঝে চলে আসেন ফোর বেঙ্গলের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল আমিনুল হক, বলেন “না স্যারকে এখন বাইরে নেয়া ঠিক হবে না। তিনি ক্যান্টনমেন্টেই থাকবেন।” এটা শুনে উত্তেজিত হয়ে উঠেন তাহের; আমিনুল হক তাতে দমে না গিয়ে তাহেরের প্রতিটি কথার পাল্টা জবাব দিতে থাকেন। আমিনুল হক বলেন “দরকার হলে বক্তৃতা এখানেই রেকর্ড করা হবে।” আমিনুল হক জানেন রুম ভর্তি এখন অনেক অফিসার যাদের একজনও তাহেরের বিপ্লবী মনোভাব বা আর্মির খোলস পাল্টে ফেলার তত্ত্ব সমর্থন করেন না; তিনি এও জানেন টু-ফিল্ড আর্টিলারীতে এখন যত না খাকি ড্রেস পরা ও পায়ে স্যান্ডেল বা সাধারন জুতা পরা তাহেরের গণবাহিনীর লোক আছে তার থেকে কয়েক গুন বেশি আছে আর্মির সাধারণ সৈনিক যাদের কাছে জিয়ার গ্রহনযোগ্যতা অনেক বেশী। তর্কের এক পর্যায় আমিনুল হক তাহেরকে বলে বসেন “আপনারাতো ভারতের বি টিম। ” এটা শুনে তাহের স্তম্ভিত। তার বিপ্লবের একটা বড় উপজীব্য ভারত বিরোধীতা, খালেদকে ভারতের দালাল বলে সৈনিকদের তাতিয়েছেন, এখন শুনতে হচ্ছে জাসদ বা গণবাহিনীই ভারতের বি টিম! এর ফাকে জিয়া বারান্দায় এসে সুবেদার মেজর আনিসকে বলেন “আনিস সাহেব, তাহেরকে কোনভাবে সরিয়ে দিন এখান থেকে। সাবধান বহু পলিটিক্স আছে।” আমিনুল হক ও তাহেরের ব্যাকবিনিময় আরও উত্তাপ ছড়ানোর আগে সুবেদার মেজর আনিস কর্নেল তাহেরের সামনে দাড়িয়ে বলে “আপনি এখন দয়া করে আসুন” অপ্রস্তুত তাহের তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস  করেন “আমাকে চেনেন?” আনিস উত্তরে বললো “জ্বি স্যার আপনাকে চিনি, তবে আপনি এখন আমার সাথে আসুন।”তাহের এর কোন বাক্যব্যায় না করে বাইরে চলে যান। উপস্থিত অফিসাররা তাহেরের আগমন বা তার  এই অগ্নিরূপের কারন না বুঝলেও বুঝতে পারে জেনারেল জিয়া এই অবসরপ্রাপ্ত কর্নেলকে এত প্রাধান্য বিনা কারনে দিচ্ছেন না। অদ্ভুত পরিস্থিতিতে তারা জিয়াকে এই ব্যাপারে কোন প্রশ্ন করেন না কিন্তু অনুরোধ করেন রেডিও তে প্রচারের জন্য একটা ভাষন রেকর্ড করবার জন্য। এ ব্যপারে জিয়ার কোন আপত্তি নেই; রেডিও তে ভাষন দেবার ব্যাপারে তার সাবলীল দক্ষতা রয়েছে।

রেডিও রেকর্ডিং ইউনিট আসলো অল্প সময়ের মধ্যেই। টু-ফিল্ডের অফিসেই রেকর্ড করা হল ভাষন। জেনারেল জিয়া বলতে শুরু করলেন… “প্রিয় দেশবাসী, আসসালামু আলাইকুম। আমি মেজর জেনারেল জিয়া বলছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জনগণ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিডিআর, পুলিশ, আনসার এবং অন্যান্যদের অনুরোধে আমাকে সাময়িকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের চিফ মার্শাল ল’ এডমিনিস্ট্রেটর ও সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করতে হয়েছে। এ দায়িত্ব ইনশাল্লাহ আমি সুষ্ঠুভাবে পালন করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। আপনারা সকলে শান্তিপূর্ণভাবে যথাস্থানে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করুন। দেশের সর্বস্থানে; অফিস-আদালত, যানবাহন, বিমানবন্দর, নৌবন্দর ও কল-কারখানগুলি পূর্ণভাবে চালু থাকবে।আল্লাহ আমাদের সকলের সহায় হোন। খোদা হাফেজ। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।” ভাষণের কোথাও কর্নেল তাহেরের নাম নেই, কোথাও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নাম নেই।

৩৩
ভোর হয়েছে কি হয়নি, এরকম সময় খন্দকার মোশতাক তার সমর্থনকারী বেঙ্গল ল্যান্সার্সের সৈনিকদের নিয়ে ঢোকেন রেডিও ষ্টেশনে। কেউ তাকে বাধা দেয় না। তিনি ধীরস্থিরভাবে একটা ঘোঘণা ড্রাফট করেন।পাশে বসা তার বহুদিনের সহকর্মী তাহের উদ্দিন ঠাকুর। ঘোষণা লেখা প্রায় শেষ এমন সময় আচমকা কক্ষে ঢোকেন কর্নেল তাহের। সাথে তার ছোট ভাই বেলাল। পতিত রাষ্ট্রপ্রধান এবং বিপ্লবী নেতা মুখোমুখী। তাহের চিৎকার করে উঠেন “আপনি কি করছেন এখানে?” বেলাল একটানে মোশতাকের হাত থেকে কাগজটি কেড়ে নিয়ে তাহেরের হাতে দেয়। তাহের ছিড়ে ফেলেন সেই কাগজ। টুকরো টুকরো কাগজ পড়ে থাকে রেডিও বাংলাদেশের মেঝেতে। মোশতাককে উদ্দেশ্য করে তাহের বলেন “ইউ হ্যাভ ক্রিয়েট এনাফ ট্রাবল ফর দিজ নেশন। নাও গেট আউট ফ্রম দিজ রেডিও ষ্টেশন! তা না হলে আপনার জিহবা টেনে ছিড়ে ফেলব”। মোশতাকের মনে পড়ে যায় মাত্র তিন দিন আগে পাকিস্তানের বিগ্রেডিয়ার ও জেনারেলদের রেফারেন্স দিয়ে কথা বলার কারনে বঙ্গভবনের ভেতর বাংলাদেশের মেজর ও কর্নেলরা কত নাজেহাল করেছে তাকে। তবে তিনি মুখে ভাবলেশ অভিব্যক্তি ধরে রাখার চেষ্টা করেন। এ কাজে তিনি পটু। তাহের পাশে দাড়ানো হাবিলদারকে হাইকে বলেন "এদের এখনই বের কর এখান থেকে।" হাবিলদার হাই ও কিছু সৈনিক টেনে হিছড়ে বাংলাদেশের চতুর্থ প্রেসিডেন্টকে রেডিও ষ্টেশন থেকে বের করে দেয়। বাইরে দাড়িয়ে মোশতাক তার টুপি,পোষাক ঠিক করেন; তারপর সৈনিকদের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসি দেন। এতে মোটেও লজ্জা লাগেনা তার। নির্লজ্জতায় তিনি ততক্ষণে প্রবাদপুরুষ।

৩৪
৭ নভেম্বর সকাল আসে যেমন আর পাঁচটা সকাল আসে। তবে আর পাঁচটা সকালে টু-ফিল্ড আর্টিলারি কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে না। আজ আছে। ৭ নভেম্বর সকালে টু ফিল্ড আর্টিলারির কমান্ডিং অফিসারের অফিসে অনুষ্ঠিত হয় এক মিটিং যা নির্ধারন করবে আগামী দিন, মাস, বছর, বাংলাদেশ কোন পথে হাটবে। এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে অংশ নেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এম জে তোয়াব, নৌবাহিনী প্রধান এম এইচ খান, জেনারেল ওসমানী, জেনারেল খলিল, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির মূখ্য সচিব মাহবুব আলম চাষী ও কর্নেল তাহের। তাহেরকে অবশ্য আমন্ত্রন জানানো হয়নি; তিনি রেডিও ষ্টেশন থেকে খন্দকার মোশতাককে বের করে দিয়ে এসেছেন টু-ফিল্ড আর্টিলারিতে জিয়ার সাথে আলোচনা করতে এবং মিটিংয়ে ঢুকে পড়েন অনাহূত হয়ে। উপস্থিত সবাই তাহেরের উপস্থিতি পছন্দ না করলেও এর প্রতিবাদ করেন না। তাহের রাষ্ট্রতন্ত্রের  কোন অংশ নন ঠীক কিন্তু তার আদেশে এখনও বিপ্লবী সৈনিকরা এবং গণবাহিনীর সদস্যরা ক্যান্টনমেন্টে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আর পৃথিবীর ইতিহাসে রাষ্ট্রের পলিসি নির্ধারন মিটিংয়ে বিপ্লবী নেতার উপস্থিত থাকার নজির সংখ্যায় অনেক কম হলেও কিছু আছে। প্রেসিডেন্ট কে হবেন এটাই মূখ্য প্রশ্ন। জিয়ার হৃদয়ের একান্ত আকাঙ্খা রাষ্ট্রপতির হবার কিন্তু তিনি নিজেকে সংযত রাখেন। তিনি আশা করেন অন্য কেউ তার নাম প্রস্তাব করলে তিনি সম্মতি জানাবেন।কিন্তু তাকে হতাশ করে জেনারেল ওসমানী ও মাহবুব আলম চাষী প্রস্তাব করেন তাদের প্রাক্তন মুনিব খন্দকার মোশতাকের নাম।এ নাম শুনে তেলে বেগুণে জ্বলে ওঠেন তাহের।জেনারেল খলিলও আপত্তি তোলেন। এরপর প্রস্তাব আসে বিচারপতি সায়েমের নাম।বিচারপতি সায়েম একদিন আগেই, অর্থাৎ ৬ তারিখ সকালেই, প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহন করেছেন।সবার মনে হয় তিনি বহাল থাকলেই সবদিক থেকেই উত্তম। এর পরের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন চীফ মার্শাল ল এ্যাডমিনিষ্ট্রেটর কে হবেন। জেনারেল খলিল যুক্তি দিয়ে বোঝান প্রেসিডেন্টেরই এই পদে থাকা বাঞ্চনীয়। বাকি সবাই খলিলকে সম্মতি দেন। যদিও এই সিদ্ধান্তও জিয়ার মনপুত হল না, তিনি কোন উচ্চবাচ্য করেন না। এরপর আলোচনা হয় সরকার চালনার খুটিনাটি নিয়ে। তাহের একসময় উঠান সৈনিকদের দাবী দাওয়ার কথা এবং একটি বিপ্লবী পরিষদ গঠন করার কথা। উপস্থিত কেউ তাতে সমর্থন দেন না; কিছুটা উপহাসের অভিব্যক্তিতেই কেউ কেউ উড়িয়ে দেন তাহেরের আর্মির খোলস পরিবর্তন করবার অবাস্তব প্রস্তাব। তাহের আশা করেন অন্তত জিয়া তাতে সমর্থন দেবেন; কিন্তু তা নিরাশায় পর্যবসিত হয়। জিয়া সম্পর্কিত তাহেরের মূল্যায়ন ‘হি উইল বি আন্ডার আওয়ার ফুট’ ভুল প্রমাণিত হয়; জিয়া ‘আবভ দ্যা রুফ’ প্রতীয়মান হন। তাহের বুঝতে পারেন সৈনিকদের নিয়ে তার বিপ্লব মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিপ্লবের স্থায়ীত্ব দশ ঘন্টা; ৭ তারিখ দিবাগত রাত ১২টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত।

৩৫
সেদিন সকালে নির্মলেন্দু গুণ বাসা থেকে বেরিয়ে দেখেন গুলি ছুড়তে ছুড়তে পিলখানার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে সৈনিকরা; কন্ঠে তাদের “নারায়ে তাকবির!আল্লাহু আকবার” ‘জিয়া-মোশতাক ভাই ভাই’, ‘জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’ , ‘খন্দকার মোশতাক জিন্দাবাদ’ স্লোগান। গোটা আজিমপুর প্রকম্পিত স্লোগানে আর উন্মাদনায়। কবি উল্লাসিত সৈনিকদের কাছে জানতে পারেন জেনারেল জিয়াকে উদ্ধার করা হয়েছে। জিয়া গৃহবন্দী হবার পর মোশতাক ক্ষমতা হারিয়েছিলেন।তবে কি জিয়ার মুক্তিতে মোশতাক আবার ক্ষমতায় বসেছেন? - ভাবেন কবি। দুপুরে তার রেডিওতে কবিতা পড়ার কথা রয়েছে। কবিতা জমা দেয়া আছে আগে। আজ live এ যাবে। কবি রওনা হলেন শাহবাগের দিকে।পথে পথে মিছিল। রেডিও ষ্টেশনে পৌছালে এক পিয়ন কবিকে দাড় করিয়ে বলল “দাদা, আপনার নিশ্চয় মাথা খারাপ হয়েছে!আপনি দুনিয়াদারির কোন খবর রাখেন না নাকি”? কবি বলেন “কি খবর?” পিয়ন উত্তর দেয় রেডিওর ভেতরে খন্দকার মোশতাক এসেছিলেন। কর্নেল তাহের তাকে টয়লেটের মধ্যে বন্দী করে রেখেছেন। কখন কি হয় বলা যায় না। কবি খুশি হন মোশতাকের বেহাল অবস্থার কথা শুনে। মনে মনে তিনি তাহেরের তারিফ করেন। হেটে হেটে যান পিজি হাসপাতালে। সেখানে তার বন্ধু কবি আবুল হাসান ভর্তি।

৩৬
বাংলাদেশের ভাগ্য যখন নির্ধারিত হচ্ছিল টু-ফিল্ড আর্টিলারির কমান্ডিং অফিসারের কক্ষে তখন শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত এমপি হোস্টেলের ১০ বেঙ্গলের কমান্ডিং অফিসারের কক্ষে মঞ্চস্থ হচ্ছিল মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হুদা এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল হায়দারের জীবনে শেষ অংক। তারা সারারাত বসে কাটিয়েছেন এই কক্ষে। তিনজনই বুঝতে পেরেছেন আশ্রয় নিতে এলেও তারা আসলে এখানে বন্দী। ক্যান্টনমেন্ট থেকে ঘন ঘন ফোন আসছে টের পাচ্ছেন তারা। তাদের নাস্তা দেওয়া হয়েছে। বাইরে হট্টগোলের শব্দ। একদল বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্য যার মধ্যে অধিকাংশ বেঙ্গল লান্সারসের সৈনিক, গেটের বাইরে থেকে ১০ বেঙ্গলের সৈনিকদের উত্তেজিত করার চেষ্টা করে। তারা জানায় খালেদ মোশাররফ একজন ষড়যন্ত্রকারী, ভারতের দালাল। তারা জানায় খালেদ মোশাররফ বেচে থাকলে দেশ ভারতের হাতে চলে যাবে। ১০ বেঙ্গলের একজন সুবেদার জানতে চান তারা কিভাবে জানতে পেরেছে খালেদ এখানে আছেন। জবাবে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার খাকি ড্রেস পড়া এক হাবিলদার চিরকুট দেখিয়ে দেয় যেখানে তাহেরের নির্দেশ রয়েছে খালেদকে নিয়ে কি করা হবে। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যরা আরও জানায় কর্নেল তাহেররই অভ্যুত্থান ঘটিয়েছেন, তিনিই এখন তাদের নেতা। পেছনে চলছে মূহমূহ স্লোগান 'সিপাহী-সিপাহী ভাই ভাই,হাবিলদারের উপর অফিসার নাই'; 'জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ', ‘কর্নেল তাহের জিন্দাবাদ’ । এদিকে ভেতরে কর্নেল নাওয়াজেশ চেষ্টা করতে থাকেন তার সৈনিকদের শান্ত রাখতে কিন্তু স্লোগানের ঢেউ আর বিপ্লবের উন্মাদনা সামল দেয়া যায় না; বাইরের সৈনিকরা ঢুকে পড়ে এমপি হোস্টেলের ভেতর। এদের সবার চোখে এখন রক্তের নেশা। ইউনিটের বাকি অফিসাররা শঙ্কিত হয়ে ওঠেন। এ শঙ্কা যতটা না খালেদের জন্য তার চেয়ে বেশি নিজেদের জীবনের জন্য। এর মধ্যে আলাদা আলাদা ফোন এসেছে ব্রিগেডিয়ার মীর শওকত ও মেজর মহিউদ্দীনের কাছ থেকে যেখানে স্পস্ট ইঙ্গিত আছে  খালেদ মোশাররফকে নিয়ে কি করা হবে। ক্ষুদ্ধ সৈনিকদের মুল চাহিদা সেই ইঙ্গিতের সাথে মিলে যায়। মীর শওকত জিয়ার সবচাইতে ঘনিষ্ট অফিসার এবং মেজর মহউদ্দীন তখন টু-ফিল্ড আর্টিলারির সর্বেসর্বা। এক পর্যায়ে মেজর জলিল ও মেজর আসাদ বিপ্লবী সৈনিকদের সাথে একাত্ব প্রকাশ করে। তারা ঢুকে পরে কক্ষে; নেতৃত্বে একজন হাবিলদার। সে চিৎকার দিয়ে খালেদ মোশাররফকে বলে “আমরা তোমার বিচার চাই।” খালেদ শান্ত কন্ঠে জবাব দেন “ঠিক আছে তোমরা আমার বিচার কর। আমাকে জিয়ার কাছে নিয়ে চলো।” কিন্তু এই সৈনিকরা তো বিচার করার থেকে দণ্ড দিতে বেশী আগ্রহী তখন;  হাবিলদার হাতের অস্ত্র খালেদ মোশাররফের দিকে তাক করে বলে “আমরা এখানেই তোমার বিচার করব।” খালেদ তখনও ধীরস্থির,শান্ত; বলেন, “ঠিক আছে তোমরা আমার বিচার কর”। সৈনিকেরা তাদের ব্যাটালিয়নের গাড়ির গ্যারেজের সামনের ফাকা জায়গায় নিয়ে যায়;ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় খড়ের গাদায়। তারপর সেই হাবিলদার ও অন্যান্য সৈনিকরা গুলি করে ও বেয়নেট চার্জ করে হত্যা করে তিনজনকে।

৩৭
৭ নভেম্বর বেলা ১১টার দিকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ঢোকেন খালেদ মোশাররফ, একটা থ্রি টন ট্রাকের পেছনে, খড়ের গাদায় শুয়ে। তার পাশে দুঃসময়ের দুই সহযোদ্ধা, সহকর্মী কর্নেল হুদা ও লেফটেনান্ট কর্নেল হায়দার।তিনজনেরই শরীরে গুলির চিহ্ন, বেয়নেটের চিহ্ন। ট্রাক এসে থামে ফোর বেঙ্গল ব্যাটেলিয়ানে। একজন  তরুন লেফটেনান্ট ট্রাক থেকে লাফিয়ে নামেন। বারান্দায় দাড়ানো লেফটেনান্ট কর্নেল হামিদের কাছ থেকে জেনে নেন জেনারেল জিয়ার অবস্থান। কমান্ডিং অফিসারের ঘরে ঢুকে সটান হয়ে স্যালুট দিয়ে তরুন লেফটেনান্ট জিয়াকে বলেন “স্যার আই  হ্যাভ কাম টু প্রেজেন্ট ইউ দ্যা ডেডবডি অব খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হুদা এন্ড লেফটেনান্ট কর্নেল হায়দার, স্যার!” কঠিন পরিস্থিতিতে ভাবলেশ থাকার পরিপক্কতা অর্জনকারী জিয়ার এই উপহারের আগমন  সংবাদ বেশ খানিকটা বিচলিত করে। তিনি তার কোর্সমেট ষ্টেশন হেডকোয়ার্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত লেফটেনান্ট কর্নেল হামিদকে বলেন মৃতদেহগুলো সিএমএইচ-এ পাঠিয়ে দিতে। কর্নেল হামিদের জীপটি তখন বিপ্লবী সৈনিকদের দখলে; তিনি সেই তরুন অফিসারকেই নির্দেশ দেন মৃতদেহগুলো সিএমএইচ-এ রেখে আসতে।অফিসারটি এই তিন বীর দেশপ্রেমিকের মৃতদেহ, যারা মারা গেছেন ভারতীয় দালালের মিথ্যে অপবাদ ললাটে এঁকে, মর্গের সামনের মাঠে ফেলে রাখাটাই শ্রেয় মনে করে।

৩৮
বাংলাদেশের সবচাইতে ক্ষমতাবান ব্যাক্তি হবার সপ্ন বহুদিন লালন করেছেন জিয়াউর রহমান। সময় এসেছে এবার মোক্ষম চালটি দেবার।প্রতিপক্ষরা একে-অপরকে কামড়ে রক্তাক্ত করেছে, হয়েছে। এক নম্বর প্রতিপক্ষ খালেদ মোশাররফ বুকে গুলির আঘাত আর পেটে বেয়নেটের আঘাত নিয়ে নিথর পরে আছেন মর্গে; দুই নম্বর প্রতিপক্ষ আবু তাহের দিশেহারা হয়ে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে সৈনিকদের পুনরায় তাতিয়ে দেবার চেষ্টা করছেন; তিন নম্বর প্রতিপক্ষ রশিদ-ডালিম-ফারুক গং ব্যাংককে অনিশ্চিত দিন পার করছে; আর সাড়ে তিন নম্বর প্রতিপক্ষ খন্দকার মোশতাক তাহেরের বুটের পারা খেয়ে নিজ গোয়ালে ফেরত গেছেন। জিয়া বোঝেন অফিসাররা সব তাকে মান্য করবে। সমস্যা একটিই, উচ্ছৃঙ্খল সৈনিকদের শান্ত করা; যে কাজটি খালেদ মোশাররফ গুরুত্ব নিয়ে করেননি, যার ফলে যেতে হয়েছে মর্গে। জিয়া সেই ভয়ঙ্কর ঝুকিসম্পন্ন কাজটি শুরু করেন; ক্যান্টনমেন্ট ঘুরে ঘুরে সৈনিকদের মুখোমুখি হওয়া। একদল অফিসার ও অনুগত বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকসহ তিনি সিগনালস ইউনিট, অর্ডিন্যান্স ইউনিট ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইউনিটে যান। সবর্ত্র তখন “জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ, কর্নেল তাহের জিন্দাবাদ” স্লোগান চলছে। জিয়া কথা বলেন হাবিলদারদের সাথে, সুবেদার মেজরদের সাথে। দাবিদাওয়ার প্রশ্ন উঠলেই হাত উঠিয়ে বলেন “তোমরা অস্ত্র জমা দাও। শৃঙ্থলা ফিরিয়ে আন। আমি দাবীগুলো দেখছি।” সৈনিকরা কিছুটা আশ্বস্থ হয়। সৈনিকরা আশ্বস্থ হওয়া মানে অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল তাহেরের লাগাম ঢিল হওয়া আর জেনারেল জিয়ার লাগাম টাইট হওয়া।

৩৮
জেনারেল জিয়া গোছাচ্ছেন যখন ক্যান্টনমেন্ট, তাহের এলিফ্যান্ট রোডে ৩৩৬ নম্বর বাড়িতে তখন মিটিং করছেন জাসদের নেতাদের ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যদের সাথে। সবাই বোঝে আর্মির চেইন অফ কমান্ড ভেঙ্গে ও জিয়ার কাধে চড়ে ক্ষমতায় যাবার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কি করা যায় আলোচনা করেন তারা।কারও মতামত জিয়ার সাথে সংঘাতে না যাওয়াটায় শ্রেয়; কারও মতামত জিয়া বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন; কারও মত এবার জিয়াকেই উৎখাত করা হোক; কারও মত পাবলিককে অভ্যুত্থানের সাথে সম্পৃক্ত করা যায়নি বলেই এই নাজুক অবস্থা। তাহের নাকচ করে দেন জিয়ার সাথে আপোষের সম্ভাবনা; সিদ্ধান্ত নেন জিয়াকে চাপ দিয়ে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার দাবী আদায় করা হবে। ১২ দফা দাবিনামা তৈরী হয় যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ঃ অবিলম্বে রাজবন্দীদের মুক্তি দিতে হবে, বাংলাদেশের সেনাবাহিনী হবে গরীব শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষাকারী গণবাহিনী, অফিসার ও জোয়ানদের ভেদাভেদ দূর করতে হবে। সৈনিকদের দাবীনামার মধ্যে রাজবন্দীদের মুক্তি দিতে হবে কোন যুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হল তা সাধারন সৈনিকরা বুঝতে অপারগ।একটি প্রাতিষ্ঠানিক সেনাবাহিনীতে উচ্চ শিক্ষিত, উচ্চ প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত অফিসারদের সাথে নিম্ন শিক্ষিত জোয়ানদের ভেদাভেদ কিভাবে দূর করা হবে তাও অস্পষ্ট থেকে গেল। বিপ্লবী শিহরনে উপস্থিত সৈনিকরা শুধু মাথা ও শরীর ঝাকিয়ে গেল।


তথ্য সূত্রঃ

জাসদের উত্থান পতনঃ অস্থির সময়ের রাজনীতি
মহিউদ্দিন আহমেদ

তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা
লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ  হামিদ

রক্তঝরা নভেম্বর, ১৯৭৫
নির্মলেন্দু গুণ

পঁচাত্তরের রক্তক্ষরণ
মেজর রফিকুল ইসলাম পিএসসি

Bangladesh A Legacy of Blood
Anthony Mascarenhas

ক্রাচের কর্নেল
শাহাদুজ্জামান

সৈনিকের হাতে কলম
নায়েক সুবেদার মাহবুবর রহমান

খালেদ মোশাররফ, ‘আঁতাতকারী’ প্রসঙ্গ ও যুক্তির প্রয়োজনীয়তা
নাদির জুনাইদ

কোন সিপাহী, কোন জনতা, কিসের বিপ্লব
শওকত মাসুম

ইতিহাসের নিরেট বাস্তবতায় নভেম্বর ১৯৭৫ 
ববি_জি

তাহেরের স্বপ্ন (চতুর্থ পর্ব)
লিখেছেন: মো. আনোয়ার হোসেন

জাসদ-গণবাহিনী সৈনিক সংস্থার বিপ্লবের চালচিত্র-২
Akram's Blog

Comments

It is really amazing in this story,I have also a best Engineering Colleges life story of me,I need to add my own College of history with affordable Price in India.I have also a collection of Biography of best peoples.I really challenged to my friends on the date of Exam Result of the University.

Popular posts from this blog

How strong is Myanmar's military?

বিমান দুর্ঘটনা

পঁচাত্তরের নভেম্বরঃ নাগরদোলায় অনৈক্য,বিভক্তি ও সংঘাত (প্রথম পর্ব)