Story of the 'plane people' in Gander after the 9/11 attack

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে হামলার দিনে, একটি Delta Air Lines (Flight 15) জার্মানীর ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় যাচ্ছিল। বিমানটির ক্যাপ্টেন ছিলেন Michael Sweeney। হঠাৎ তিনি আটলান্টার প্রধান কার্যালয় থেকে বার্তা পেলেন যে U.S. Federal Aviation Authority তাদের আকাশ পথ অনিবার্য কারনে বন্ধ করে দিয়েছে ফলে কোন বাণিজ্যিক বিমান যুক্তররাষ্ট্রের কোন বিমানবন্দরে অবতরণ করতে পারবে না। Flight 15 এর পাইলট ও ক্রুরা অনুমান করে নিয়েছিলেন যে মারাত্মক কিছু একটা ঘটেছে এবং তাদের দ্রুত নিকটতম বিমানবন্দরে অবতরণ করা উচিত। ক্যাপ্টেন Michael Sweeney হিসাব করে দেখলেন যে নিকটতম বিমানবন্দর কানাডার Gander। সেখানে অবতরণের জন্য কানাডিয়ান ট্রাফিক নিয়ন্ত্রকদের কাছে অনুরোধ করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি অনুমতি পেয়ে যান; তাকে আর কোনো বাড়তি প্রশ্ন করা হয়নি। যখন বিমানটি Gander বিমানবন্দরে অবতরণ করবে ঠিক সেই মুহুর্তে আটলান্টা থেকে আরো একটি বার্তা পান পাইলট। সেখানে উল্লেখ করা হয়-নিউইয়র্কে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে।

কানাডার New Foundland প্রভিন্সের Gander বিমান বন্দরে Delta Air Lines Flight 15 বিমানটি দুপুর সাড়ে বারোটায় অবতরণ করে। পাইলট ও ক্রুরা দেখলেন আরও বিমান আসছে। একে একে ৩৮ টি বিমান সেদিন Gander বিমান বন্দরে অবতরণ করে।

এমন সময় আমেরিকায় কি ঘটেছে সেটার তথ্য আস্তে আস্তে বিমানের রেডিওতে আসতে শুরু করে। সন্ধ্যার দিকে খবর জানা যায় যে, World Trade Center এ দুইটি ছিনতাইকৃত বিমান আঘাত হেনেছে আর তাতে দালানদুটি ধ্বসে পড়েছে।

রাতে কানাডিয়ান গ্রাউন্ড কন্ট্রোল থেকে জানানো হয় তারা একটি একটি করে রানওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকা বিমানের যাত্রীদের বাইরে আসার সুযোগ করে দেবে। Delta Air Lines এর ফ্লাইটটির জন্য সময় নির্ধারণ হয় পরেরদিন সকাল ১১টা। যাত্রীরা খানিকটা বিরক্ত হয়েই বিমানেই রাত্রিযাপনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। Gander বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষ ঔষধ, পানি, হাতমুখ ধোওয়া ও শৌচাগারের ব্যবস্থা করে। কোনো ঝামেলা ছাড়াই রাত পার হয় যদিও কেউই শান্তিতে ঘুমাতে পারেনি।

১২ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে দশটায় কিছু স্কুলবাস বিমানবন্দরে ঢুকে। তার মধ্যে কিছু এসে দাঁড়ায় Delta Air Lines বিমানের কাছে। যাত্রীদের নেমে আসতে বলা হয়। তাদের সবাইকে বিমান বন্দর টার্মিনালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সকল যাত্রীদের ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের কাজ সারতে হয়। পাশাপাশি রেড ক্রসের স্বেচ্ছাসেবীদের কাছে নাম নিবন্ধন করতে হয়। এরপর ক্রুদের আলাদা একটি ভ্যানে করে ছোট একটা হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। জানানো হয় যে, যখন যুক্তরাষ্ট্র বিমান চলাচলে অনুমতি দেবে তখন যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।


কর্তৃপক্ষ Gander ও এর আশেপাশের ৭৫ কিলোমিটারের মধ্যে থাকা সব হাইস্কুল, কমিউনিটি সেন্টার, আশ্রয়স্থল ও সভাস্থলে আটকে পরা যাত্রীদের থাকার জন্য নির্দেশ দেয়। আর Gander এর দশ হাজার স্থানীয় মানুষ ৩৮ টি বিমানের প্রায় সাত হাজার যাত্রীর দেখভালের দায়িত্ব নেয়। বন্ধুসুলভ Gander বাসী যাত্রীদের ডাকা শুরু করে ‘plane people’।

হাইস্কুলের ছাত্রদের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে অনুরোধ জানানো হয়; সবাই এগিয়ে এসে ‘plane people’ দের সেবা করতে শুরু করে। Delta Air Lines Flight 15 এর ২১৮ জন যাত্রী যেখানে থাকার সুযোগ পেয়েছিল সেই শহরের নাম Lewisporte । সেখানকার একটি হাইস্কুলে এই ২১৮ জন যাত্রীর থাকার ব্যবস্থা করা হয়। যারা পরিবার নিয়ে এসেছেন তাদের সবাইকে একসঙ্গে থাকতে দেওয়া হয়। সব বয়স্ক যাত্রীদের নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয়দের বাসায়।
স্থানীয় বেকারিগুলো ২৪ ঘন্টা খোলা রাখা হয়। Twillingate শহরবাসী প্রতিবেলা ২০০ মানুষের খাবার – মুলত সেন্ডউইচ আর সুপ, নিয়ে আসতো ‘plane people’ দের জন্য। স্থানীয় দোকানগুলো টুতপেস্ট, ব্রাশ, সাবান আর কম্বল এনে দিত। এর জন্য তারা কোন দাম রাখেনি।এছাড়া সব যাত্রীদের লন্ড্রির টোকেন দেওয়া হয়েছিল। যাত্রীদের কারো লাগেজই বিমান থেকে আনতে দেওয়া হয়নি তাই অনেকেই এক কাপড়ে এসেছেন। স্থানীয় মানুষজন ও হাইস্কুলের ছাত্ররা কাপড়-চোপড় থেকে শুরু করে সব ধরণের জিনিসপত্র দিয়ে বিমানের যাত্রীদের সাহায্য করেছিলো।

সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখে জানানো হয় যে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বন্দরগুলো পুনরায় চালু করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থান থেকে যাত্রীদের সঠিক সময়ে Gander বিমান বন্দরে পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুরু হয়। স্থানীয় রেড ক্রসের প্রতিনিধিদের কাছে প্রত্যেক যাত্রীদের নিবন্ধন ছিল। তারা যাত্রীদের সঠিক হিসাব রেখেছিলেন এবং জানতেন কখন কোন বিমান ছেড়ে যাবে এবং কখন কোন যাত্রীদের বিমান বন্দরে আনতে হবে। সবকিছুর সমন্বয় হয়েছিল চমৎকার ভাবে।


যখন Delta Air Lines এর সব যাত্রীরা বিমানে উঠল তখন মনে হল সবাই প্রমোদ ভ্রমণে আছে; সব যাত্রী আনন্দিত, হাসিখুশি। সবাই সবাইকে চেনেন। এতোই চেনেন যে নাম ধরে ডাকতে পারছেন। অবস্থানকালীন সময়টা কে কিভাবে উপভোগ করেছে সেটা নিয়ে গল্প জুড়ে দেন যাত্রীরা। একে অন্যকে গল্প বলে মুগ্ধ করার চেষ্টা করতে থাকেন। কার থেকে কে ভালো সময় কাটিয়েছে সেটা নিয়ে জমে উঠল আড্ডা। ফ্লাইটটি একসময় আটলান্টায় ফিরে আসল। পুরোটা সময় যাত্রীরা গল্প করছিলেন এবং ফোন নম্বর, ঠিকানা ও ই-মেইল অ্যাড্রেস আদান-প্রদান করছিলেন। হঠাৎ Shirley Brooks নামের একজন যাত্রী উঠে গিয়ে ক্রুকে জিজ্ঞেস করলেন- আমি কি আপনাদের PA system (বিমানের সাউন্ড সিস্টেম) দিয়ে একটা ঘোষণা দিতে পারি? ক্ররা সাধারণত এটা করতে অনুমতি দেন না কিন্তু এই পরিস্থিতে একজন ক্রু বলে উঠলেন- অবশ্যই পারেন। Shirley Brooks মাইক্রোফোনটি হাতে নিয়ে সবাইকে আরো একবার মনে করিয়ে দিলেন গেল কয়েটা দিন তারা কেমন কাটিয়েছেন, কি অবস্থার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন সে বিষয়টি। Lewisporte শহরের স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে তারা যে আতিথিয়েতা পেয়েছে সেটাও তিনি স্মরণ করিয়ে দিলেন। তারপর তিনি বললেন যে ফ্রাঙ্কফুট ফিরে গিয়ে তিনি Lewisporte শহরের স্থানীয় লোকজনের জন্য কিছু করতে চান।

Shirley Brooks বললেন Delta 15 নামে তিনি একটি ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করতে চান। এই ট্রাস্ট ফান্ডের কাজ হবে Lewisporte শহরের হাইস্কুল ও কলেজের মেধাবী ছাত্র ছাত্রীদের বৃত্তি দেওয়া। তার সহযাত্রীদের কাছ থেকে তিনি বিনীত ভাবে ডোনেশন চাইলেন। তুমুল হাততালির মাধ্যমে এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানালো অন্য যাত্রীরা।

ডোনেশন নেয়া শুরু হলো। ডোনেশনের কাগজটিতে নাম, ফোন নম্বর, ঠিকানা ও ই-মেইল অ্যাড্রেস লিখতে হলো। দেখা গেল ১৪ হাজার ডলার ডোনেশন উঠেছে। Shirley Brooks প্রতিশ্রুতি দিলেন যে তিনি দ্রুত বৃত্তির জন্য প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করে দেবেন। শেষ পর্যন্ত ওই ট্রাস্ট ফান্ডে ১.৫ মিলিয়ন ইউএস ডলার জমা পড়েছিল। এই ফান্ড থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত Lewisporte শহরের বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের ১৩৪জন ছাত্রকে বৃত্তি দেওয়া হয়েছে।

Gander এর স্থানীয়দের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে Lufthansa একটি Airbus A340 এর নাম দেয় Gander/Halifax। আমেরিকান টিভি চ্যানেল CBC ২০০৯ এ বের করে Diverted নামে একটি সিনেমা যেখানে টুইন টাওয়ারে হামলার পরের মুহূর্ত, Gander শহরের আতিথিয়েতা এবং ‘plane people’ দের সঙ্কটকালীন সময়ের উৎকণ্ঠা দেখানো হয়েছে।

Shirley Brooks এখন বেশ বুড়ো হয়ে গেছেন তবু বছরে অন্তত একবার তিনি Lewisporte শহরে যান। প্রতিবারই যেয়ে দেখেন Delta Air Lines Flight 15 এর অন্য অনেক যাত্রীও বেড়াতে এসেছেন। একই অবস্থা Gander এর অন্য শহর গুলোতেও। সেই সময়ের আটকে পড়া সাত হাজার ‘plane people’ হয়তো আজীবনের জন্য Gander বাসীর আত্মার আত্মীয় হয়ে গেছেন।

Comments

Popular posts from this blog

How strong is Myanmar's military?

বিমান দুর্ঘটনা

পঁচাত্তরের নভেম্বরঃ নাগরদোলায় অনৈক্য,বিভক্তি ও সংঘাত (প্রথম পর্ব)